57 / 100

তখন ইমরান হাশমি পয়লা বেড়াতে এসেছে ইয়াং স্টারদের মাঝে। একেকজন কি যে খুশি মাইরি। হালকা দেরি হয়ে গেছে ‘আশিক বানায়া আপনে’ দেখতে। একজন তো বলেই ফেলল-‘তুই তো ক্ষ্যাত, এখনো হাশমি+তনুশ্রী দেখস নাই! কী কিসিং কী উরু, কী গরম গরম ভাব!’ ১৮+ নিয়ে কোনো টেনশনই নাই।

ডিপজল যেবার আইলো ভালগার কারে কয়, ১৮+ কারে কয় কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিলো। সিনেমাহলের সামনে দিয়ে গেলে লোকে মুখস্থ ডায়লগবাজি করে-‘ও লে লে লে, আহো ভাতিজা আহো, হালকার উপর ঝাপসা, সিস্টাম কইরা দিমু, পুত কইরা দিমু, ওয়ান টুতে খালাস করুম, নাটকির পো’ আরো কত কি! মুখের লাইসেন্স বলে যে ধুয়া ধরে লোকে সেটার কোনো বালাই নাই। সমানে শিখিয়ে দিলো ডিপজল তারপর হাটে-মাঠে-ঘাটে সবখানে খালি ডিপজল কেরামতি। ১৮+ নিয়ে কোনো টেনশনই নাই।

৩৫ মিলিমিটারের লাল দাগ ওঠা ছবি সব নীল হয়ে গেল। ওরে বাপরে বাপ! সিনেমাহলের সামনে দিয়ে গেলে মনে হয় হাট বসেছে। ব্ল্যাকে টিকেট কিনেও ঢুকে পড়ত হলের ভেতর। ছবি তো দেখার জন্য যেত না। যেত কাটপিস দেখতে। নাম সব মুখস্থ আন্ডা বাচ্চা পোলাপানের মুখেও। ধান কাটতে যাওয়া চাচারা জোরে জোরে বলত আর ধান কাটত। ‘কি রে কালকে কোনটা দেখলি?’ বলে-‘মহিলা হোস্টেল, ওরে ভাই সেই সেই।’ আরেকজন যোগ করে-‘একজন তো পাট দিলো দে ঢুকায়া, ওরে ভাই ডায়লগ রে!’ গানের কথাও বাদ যায় না-‘দরজা জানালা সব বন্ধ করে খেলা হবে দুজনে অন্ধকারে’ কিংবা ‘যৌবন আমার লাল টমেটো।’ কাড়ি কাড়ি অশ্লীল ছবির নাম-‘চম্পারাণীর আখড়া, মহিলা হোস্টেল, ডান্ডা মেরে ঠাণ্ডা, গজব, জঙ্গল, ডেণ্ঞ্জার সেভেন, কাউন্টার অ্যাটাক, লাকি সেভেন, নাইট ক্লাব, মডেল গার্ল, ড্যাম কেয়ার, ঠ্যাকবাজ, স্পট ডেড, চান্দি গরম, চক্কর’ আরো কত কি! কাকরাইল ফিল্মপাড়া থেকে দশ হাজার টাকায় কাটপিস কিনে ছবির মাঝখানে ঢুকিয়ে দিত। তখন বুড়া, আন্ডা বাচ্চা সব এক বয়সের হয়ে গিয়েছিল ভাইসব। চলচ্চিত্রের বারোটা বাজিয়ে তেরোটা হয়ে এক্কেবারে ত্যানা ত্যানা অবস্থা। ১৮+ নিয়ে কোনো টেনশনই ছিল না।

নারী Cinema Poster
নিষিদ্ধ নারী Cinema Poster By bMDB

নিষিদ্ধ নারী’-র পোস্টার চোখে ভাসে। মুনমুনের ইয়া বড় ন্যাড়া মাথা, কানে প্রমাণ সাইজের দুই দুল লাগানো ভয়ঙ্কর এক পোস্টার। পোস্টারের গায়ে সুন্দর করে লেখা-‘নগ্নতা মানেই অশ্লীলতা নয়।’ হাইস্কুলের ছাত্র তখন আমি। থানাশহরে পোস্টারের গায়ে লোকে থু থু ছিটাত তবে সবাই না। কিছু লোক তো গেল ছবিকে হিট করতে আর হলোও তাই। কিন্তু ঐ যে ‘নগ্নতাই অশ্লীলতা নয়’ মারাত্মক সেই শ্লোগান পোস্টারে দেয়া হলো ব্যাস সব হালাল। ‘টাইটানিক’-এ কেট উইন্সলেট নগ্ন হলো আর লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও তার ছবি আঁকল। সেটার আবেদন, শৈল্পিকতা কি আর ‘নিষিদ্ধ নারী’-র হর্তাকর্তা বুঝবে! কিন্তু শ্লোগান ঠিকই হাজির-‘নগ্নতাই অশ্লীলতা নয়।’ তাই নীল ছবি যেগুলা হয়ে গিয়েছিল গিলতে থাকল অনেক লোক। নগ্ন ছেলেমেয়েদের দিয়ে বানানো কাটপিসকে ‘অশ্লীলতা নয়’ বাণীতে আনা হয়েছে। তখন ১৮+ নিয়ে কোনো টেনশনই ছিল না কোনো।

তারপর তো আমগো দেশেও মোবাইল, ইউটিউব, ল্যাপটপ, ট্যাব কতকিছু এলো। ১৮ বছর লাগল না আর। স্কুল না পেরুতেই ফোন ব্যবহার শুরু আর ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পার্কে যাওয়ার আয়োজন। ক্যামেরায় ধরা পড়লে পালাতে থাকে। রসু খাঁ সিরিয়াল কিলার হয়, রাজন ঘাম না খেতে পেরে মারা যায়, নুসরাত পুড়ে মরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পহেলা বৈশাখে যৌন হয়রানি হয়, ঝোঁপের আড়ালে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে টেনে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা চলে, আবরার ফাহাদকে বুয়েটে পিটিয়ে মারা হয়। সবই দেখতে হয় আমাদের করার কিছুই থাকে না। করতে হয় না ১৮+ টেনশন।

জ্য পল সার্ত্রে-সিমন দ্য বিভোয়ার লিভ টুগেদার করত। সরাসরি বলে দিয়েই তারা করত এটা। কোনো লুকোচুরি ছিল না। ওপেন পার্কে পতিতাবৃত্তি কিংবা সিনেমাহলকে পতিতালয় বানিয়ে ব্যবসা করা হলে সেটা চোখের সামনে দেখতে কোনো প্রব্লেম হয় না। বলিউড মুভি দেখতে বসলে কয়টা বেড সিন কয়টা লিপলক আছে হিসাব কষে দেখতে বসতেও কোনো প্রব্লেম হয় না। কোনো ১৮+ টেনশন তখন কাজ করে না।

১৮+ টেনশন খালি নিজের বেলায়। বাস্তবটাকে অস্বীকার করে ক্যান গালি দেয়া হলো ওয়েব সিরিজে, ক্যান বেডসিন দেখালো, ক্যান যুবসমাজকে ধ্বংস করা হচ্ছে আরো কত ছবক! ওদিকে আবার যুবসমাজ বাবা খেয়ে টাল হয়ে আছে ওটা নিয়ে কোনো টেনশন নেই। ধর্ষণ বাস্তবে হবে কিন্তু ওয়েব সিরিজে দেখানো যাবে না, বাস্তবে গালি দেবে কিন্তু নাটক, সিনেমায় দেখানো যাবে না (অনেকের মতে বিপ দিয়েও না), বাস্তবে আট/দশটা রিলেশন করা যাবে নাটকে, সিনেমায়, ওয়েব সিরিজে দেখানো যাবে না, বাস্তবে টিকটক ভাইরাল হওয়া যাবে কিন্তু নাটকে দেখানো যাবে না যুবসমাজ, যুবতীসমাজ ধ্বংস হবে। তলে তলে যে ধ্বংস হয়ে বসে আছে তার কোনো টেনশন নেই। তারপর সিনেমার সেন্সর বোর্ডের মতো নাটকেও ছুরি, কাঁচি চালিয়ে বলবে এটা দেখানো যাবে না ওটা দেখানো যাবে না। একদম সুন্দর ফকফকা সমাজে আমরা বাস করি তাই কোনো নেগেটিভ জিনিস দেখানো যাবে না। এখানে অনেক অনেক ১৮+ টেনশন।

august 14 bengali web series
আগস্ট ১৪ Web Series

আগস্ট ১৪‘ বানিয়ে ডিরেক্টর মহাভুল করেছেন, ‘সদরঘাটের টাইগার’ বানানোর দরকার ছিল না জাতীয় বাণী দিয়ে সয়লাব করা হবে ফেসবুক। সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুয়ে দেয়া হবে নীতিকথার লিস্ট সাজিয়ে। অথচ এরা শহরের যে গলিতে থাকে মা-বোন রাতের বেলা হাঁটতেও সেখানে নিরাপদ বোধ করে কিনা সে খবর রাখেও না। হিপোক্রেসি লেভেল ক্রস করে বর্ডার পার। ‘গেল গেল দেশটা রসাতলে গেল, জাত গেল জাত গেল’ বলে মাথা খারাপ করে ফেলতেছে। বেচারা ডিরেক্টররা পরে কি করবে! ১৮+ টেনশনে বানানোই বাদ দেবে কদিন পর। চুলে জেল মেখে নায়িকাকে ‘আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না’ ডায়লগে রোমান্টিক নায়কের কেমিস্ট্রিতেই তারা ফিরবেন আবার আর হিপোক্রেট সেসব বাস্তবকে অস্বীকার করা দর্শকরা কড়া হাততালি দিয়ে বলবে-‘ওয়াও, কি নাটক দেখলাম!’ আর কোনো ১৮+ টেনশন নাই।

আর উপসংহারে এসে বলে দিচ্ছি স্পষ্ট করে-‘ডিরেক্টর ভাইরা ১৮+ টেনশন বাদ দেন, সমাজের বাস্তবটাকেই সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুয়ে দেন আর ডেটল বি ১০০% সিওর করেন বাস্তব যারা দেখতে চায়।’ টা টা।

লেখক: রহমান মতি, চলচ্চিত্র সমালোচক