65 / 100

১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের হকিন্স শহরের চার কিশোরের গল্প নিয়ে তৈরি স্ট্রেঞ্জার থিংগস। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ভিত্তিক জনপ্রিয় এই সিরিজ প্রথম দর্শকদের সামনে আসে ২০১৬-এর জুলাইয়ে। এর পরিবেশনায় আছে মার্কিন ইন্টারনেট ভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক নেটফ্লিক্স

যারা সিরিজ দেখেন না, তাদের অভিযোগগুলোর মধ্যে বড় একটা অভিযোগ হল ফিল্মের চেয়ে তুলনামূলক স্লো বিল্ড আপ আর স্ক্রিনপ্লে। ফিল্মের দর্শক যারা আছেন তাদের বড় একটা অংশ ফাস্ট স্ক্রিনপ্লে এর স্টোরিলাইন পছন্দ করেন, এইজন্য সিরিজে তাদের অনেকেরই মন বসে না। এরকম ধাঁচের দর্শকদের জন্য পারফেক্ট একটি সিরিজ হচ্ছে এই স্ট্রেঞ্জার থিংগস। এছাড়া যারা সিরিজ দেখা শুরু করতে চাচ্ছেন কিন্তু কোনটির মাধ্যমে শুরু করবেন সেটা ভেবে পাচ্ছেন না, তাদের জন্যও এই সিরিজটি একদম আদর্শ। তবে হ্যাঁ, টিনেজারদের একটু বেশিই ভাল লাগবে বৈকি! এক কথায়, টিনেজারদের প্রাধান্য দেয়া হলেও সকল বয়সী সকল শ্রেণির দর্শকের জন্যই এটি তৈরি করা হয়েছে।

১৯৮৩ সাল। ইন্ডিয়ানার হকিন্স নামক একটি জায়গা৷ গ্রাম আর শহরের মাঝামাঝিই বলা যায়৷ শান্তিতে বসবাস করার জন্য চমৎকার এক পরিবেশ, যেখানে প্রায় সবাই সবাইকে চেনে৷ অপরাধের সংখ্যা একদমই শূন্যের কোঠায় থাকায় পুলিশদেরও দিন কাটে নিজেদের অফিসে হেলেদুলে। মার্ডার তো দূরের কথা, লাস্ট সুইসাইড কবে হয়েছিল তাও মনে নেই সেখানকার মানুষদের।

Stranger Things
স্ট্রেঞ্জার থিংগস- নেটফ্লিক্স

এই শান্ত পরিবেশের বিঘ্ন ঘটাতে হঠাৎ করেই একদিন উইল বায়ার্স নামের ১২ বছরের এক ছেলে উধাও হয়ে যায় বাড়িতে ফেরার পথে। পুলিশ চিফ জিম হপার প্রথমে কেসটা খুব হালকাভাবে নিলেও আস্তে আস্তে তিনি বুঝতে থাকেন যে এটি সাধারণ কোন রহস্য নয়, অনেক বড় কোন বিষয় লুকিয়ে আছে ছোট্ট এই ঘটনার পেছনে। পুলিশ হিসেবে অফিসিয়াল ইনভেস্টিগেশনের পাশাপাশি পারসোনাল ইনভেস্টিগেশনও শুরু করেন তিনি। তার পাশাপাশি আলাদাভাবে এই রহস্যের পেছনে ধাওয়া করতে শুরু করে উইলের তিন বন্ধু – মাইক, লুকাস আর ডাস্টিন। নিজের ভাইয়ের খোঁজে লেগে পড়ে উইল বায়ার্সের ভাই, শখের ফটোগ্রাফার জোনাথন বায়ার্সও। বিষয়টি আরো ঘোলাটে হয়ে ওঠে তখন, যখন এসবের মধ্যে ঢুকে পড়ে শেভড হেড এর অদ্ভূতুরে এক মেয়ে; যেখানে উইল উধাও হয়ে গিয়েছিলো ঠিক সেখানেই অন্ধকার এক রাতে পাওয়া যায় তাকে। বিভিন্নজনের ভিন্ন ভিন্ন পথের সব ইনভেস্টিগেশন যখন পুরো রহস্যকে আরো ঘনীভূত করে তুলছিলো তখন অদ্ভূত সব জিনিস দেখতে শুরু করেন উইল এর মা জয়েস বায়ার্স, তার মনে হতে থাকে যে তার ছেলে তার কাছেই কোথাও আছে, বন্দী হয়ে৷ অদ্ভূত উপায়ে সে নাকি যোগাযোগের চেষ্টাও করছে! তার এই ভিত্তিহীন কথাবার্তাগুলো কি আসলেই ভিত্তিহীন নাকি সত্যিই হকিন্সের মনোরম দিনগুলোকে বিষাদময় করে তুলতে এমন কিছুর আবির্ভাব ঘটেছে যেটার বিন্দুমাত্র ধারনাও কেউ করে নি? এই কঠিন রহস্য ভেদ করে কি আদৌ ফিরে পাওয়া যাবে উইল বায়ার্সকে? শেভড হেড এর সেই ‘উইয়ার্ডো’ মেয়েটার আবির্ভাবের রহস্যই বা কী?

এসবের উত্তর পেতে চাইলে দেখতে হবে নেটফ্লিক্সের অসাধারণ এই সৃষ্টি ।

সিরিজটির চরিত্রগুলোর কথা বললে প্রথমেই আসবে উইল এর তিন বন্ধু মাইক, লুকাস আর ডাস্টিন। এছাড়া এল, মাইকের বোন ন্যান্সি, উইলের ভাই জোনাথন কিংবা তাদের হাইস্কুলের পপুলার ‘লেডি কিলার’ চরিত্র স্টিভ হ্যারিংটন, সকলেই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। লিডিং ক্যারেক্টারে আরো আছেন হকিন্স পুলিশের চিফ জিম হপার আর কিছুটা পাগলাটে ধরনের জয়েস বায়ার্স। রহস্যভেদ এর পাশাপাশি এখানে দেখানো হয়েছে টিনেজ বয়সের সকল খামখেয়ালি মনোভাব আর দুরন্তপনা, সাথে ছোট ছোট সব খুঁটিনাটি বিষয়, টিনেজ ইস্যু বলতে যা বোঝায় আর কি। যারা ছোটবেলায় ক্ষুদে গোয়েন্দাদের গোয়েন্দাগিরি দেখতে বা পড়তে ভালবাসতেন কিংবা নিজেদের এধরনের চরিত্র হিসেবে কল্পনা করতেন তারা মাইক, লুকাস কিংবা ডাস্টিনের মধ্যে খুঁজে পাবেন সেই পুরনো নিজেদের। এর সাথে আছে টিনেজ বয়সের ‘প্রথম রোমান্স’ টাইপ ব্যাপারগুলো, যার বেশিরভাগ অংশ ওয়েস্টার্ন কালচার হলেও আমাদের দেশের সাথে যে রিলেটেবল না তা নয়, আর বর্তমান যুগের কথা বললে তো একেবারেই রিলেটেবল! সর্বোপরি, টিনেজ ভিউয়ারদের প্রাধান্য দিয়ে সব বয়সীদের জন্য উপযোগী একটি শো হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন তার সবকিছুই করা হয়েছে এই সিরিজটিতে। আশির দশকের পটভূমি ফুটিয়ে তোলা, সেই সময়ের গাড়ি কিংবা ড্রেস আপ স্টাইল ফলো করা, স্পেশাল এফেক্টের ব্যবহার, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক – সবকিছুই খুব যত্ন সহকারে করা হয়েছে। সিনেমাটোগ্রাফি আর লাইটিং অন্যান্য সিরিজের মত না করে করা হয়েছে হালকা চালের ফিল্মি স্টাইলে, ‘দ্য গুনিজ’ টাইপ ফিল্ম যারা দেখেন তারা কিছুটা রিলেট করতে পারবেন। তবে, আমার কাছে সবচেয়ে সেরা যে ব্যাপারটা লেগেছে সেটা হল বিভিন্ন মোমেন্টে মিউজিক এর চয়েস। পারফেক্ট সব মোমেন্টে পারফেক্ট সব মিউজিক ট্র‍্যাকের ব্যবহার এর বিভিন্ন সিন এর গভীরতা অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে৷ বিশেষ করে কুইন, দ্য পুলিশ, কেনি রজার্সদের সৃষ্টির অভূতপূর্ব সব ব্যবহার আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছে এর বিভিন্ন দৃশ্যকে! সেকেন্ড সিজন এর লাস্ট এপিসোড এর শেষের কয়েক মিনিট দেখলে খুব ভালভাবে বুঝতে পারবেন এই ব্যাপারটা (ফরেভার অ্যালোনদের হালকা করে কষ্টও লাগতে পারে, সেটা যার যার পারসোনাল ব্যাপার FACE WITH COLON THREE:3)!

Stranger Things
স্ট্রেঞ্জার থিংগস- নেটফ্লিক্স

কাস্টিং এর ব্যাপারে আসি। উইনোনা রাইডার আর ডেভিড হার্বার ব্যতীত মোটামুটি সব চরিত্রে কিছুটা অনভিজ্ঞ বা নতুন মুখ নেয়াটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জের মত ছিল। কিন্তু ফার্স্ট সিজনেই সবার অসাধারণ পারফরম্যান্স বড়সড় সাফল্য এনে দেয়ার পর আর কাওকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। স্ট্রেঞ্জার থিংগসের ইলেভেন বা এল নামক ক্যারেক্টারের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করা মিলি ববি ব্রাউন এখন বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত টিনেজ সেলিব্রিটি।

এখন পর্যন্ত তিনটি সিজন রিলিজ হয়েছে এই সিরিজের, মোট এপিসোড সংখ্যা ২৫টি, যেখানে প্রথম ও তৃতীয় সিজনে আছে ৮টি করে আর দ্বিতীয় সিজনে আছে ৯টি এপিসোড। অনেকের মতে তৃতীয় সিজনটা আগের দুই সিজনের মত জমেনি, স্ট্রেঞ্জার থিংগসের স্পেশালিটি থেকে বের হয়ে অনেকটুকু গতানুগতিক ধারায় চলে গিয়েছে (আমেরিকানদের ফিল্ম-সিরিজে রাশিয়ানদের জোর করেই ভিলেন না বানালে কি আর চলে? ব্যাপার আছে না একটা?) ; তবে চতুর্থ সিজনে অনেক বড় ধামাকার বেশকিছু আলামত যে রেখে গেছে এই থার্ড সিজন সেটা একদম নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

তবে আর কী? টিনেজ গোয়েন্দাগিরির সাথে ফ্যান্টাসি ঘরানার সাই ফাই, অল্পসল্প রোম্যান্সের সাথে অনেকটুকু থ্রিল আর সাসপেন্স এবং এর সাথে কিছুটা হরর অ্যাডভেঞ্চারের মিশেলে তৈরি এই সিরিজটি দেখতে এখনি বসে পড়ুন! স্পেশাল এফেক্টের এই যুগে এই ধরনের কনটেন্ট এখন অনেক তৈরি হয়, কিন্তু কমবয়সীদের প্রাধান্য দিয়ে তৈরি এক সিরিজ আইএমডিবিতে ৮.৮ রেটিং ধরে রেখেছে, এই ব্যাপারটি খুবই চমকপ্রদ! কেন? সেটা তো দেখলেই বুঝবে পারবেন। স্টেঞ্জার থিংগসের এই মাল্টিডাইমেনশনাল রহস্যের দুনিয়ায় আমন্ত্রণ রইলো সবার। খুদে গোয়েন্দা আর পুলিশদের সাথে আপনিও লেগে যেতে পারেন এই রহস্যভেদ করতে!

হ্যাপি ওয়াচিং!