56 / 100

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ১৯৬০ সালের “মেঘে ঢাকা তারা”। মুক্তির এতো বছর পরেও এই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা কিংবা আজকের এই আধুনিক সমাজের আধুনিক মানুষের মানুষের হৃদয়কেও ছুঁয়ে যেতে এই চলচ্চিত্রের এতটুকু বেগ পেতে হয় না। বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ সময়ের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ এই চলচ্চিত্র শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, সমাদৃত হয় বিদেশেও ঠিক যতখানি সমাদৃত ঋত্বিক ঘটক নিজেও।

একজন আত্নত্যাগে বলিয়ান নারীর কথা যে নিজের ছোট ছোট সুখগুলোকেও অন্যদের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে বার বার হত্যা করে ফেলে। নিজের সর্বচ্চোটুকু দিয়েও যেনো এই পৃথিবীর মানুষের সামান্য কৃতজ্ঞতাবোধ পাওয়াও হয়ে ওঠে না।

কেরাম খেলার সময় সব খেলোয়াড়ের নজর থাকে লাল গুটির উপর কিন্তু, যতক্ষন না আপনি কাভার দিতে পারছেন ততক্ষণ না লাল গুটি আপনার। অর্থাৎ, লাল গুটির ৫ পয়েন্ট পেতে গেলে আপনাকে সাহায্য করছে আরেকটি সাধারণ গুটি। কিন্তু, কাভারটা হয়ে গেলে খেলোয়াড়ের উল্লাস ঐ লাল গুটিকে কেন্দ্র করেই। তখন আর কাভার দিতে যেই গুটির দরকার পরলো তার কোনো মূল্যই থাকলো না। আমাদের বাস্তব জীবনও কেরাম খেলার মতোই কারন আমাদের লক্ষ্যে পৌছে গেলে তখন আর আমরা অনেকেই যে লক্ষ্যে পৌছাতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখলো তাকে আর মনে রাখি না।

নীতার একার টিউশনে কামাই করে টাকাকড়ি দিয়ে সংসার চলছে। মাঝে মাঝে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে মানুষ নিজের রক্তের মানুষের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিতেও পিছপা হয় না। সেটা হোক মা, বোন, কিংবা ভাই। সব প্রেম অপেক্ষা করতে পারে না, কিছু প্রেম সময়ের স্রোতের অনূকূলে গা ভাসিয়ে দিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার চেয়ে অনেক দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের এক প্রান্ত দূরত্বেও চলে যায় যাকে আর চাইলেও ফেরানো যায় না। সবমিলিয়ে গ্রামীন সমাজের একটা অভাবী পরিবারকে ঋত্বিক ঘটক এতটা স্পষ্টতর করে চলচ্চিত্রের রিলে আটকে ফেলেছেন যে মনে হবে আরে এটা তো আমার গল্প, নতুবা আরে এই গল্পটাতো ওর জীবনের মতো। তবে নীতা শেষমেশ বলেও গিয়েছে- সব সহ্য করে নেয়াও একরকম পাপ যার জন্যও পোহাতে হয় প্রহর। আর মেঘের আড়ালে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাদের হারিয়ে যাবার গল্পের “মেঘে ঢাকা তারা” নামের সার্থকতাটুকু এখানেই।

সমীরন চৌধুরীর গল্পে তৈরি ঋত্বিক ঘটকের এই কালজয়ী চলচ্চিত্রে যারা অভিনয় করেছেন তাদেরকে নিয়েও বলতে গেলে ঠিকঠাক বিশেষনের অভাব। নীতা চরিত্রে সুপ্রিয়া চৌধুরীর মুচকি করে হাসা, মুখ অন্যদিকে তাক করে মিষ্টি করে চোখের ইশারায় এক মহাকাব্য জীবনের বর্ণনার প্রেমে না পরে যে উপায় নেই। এতো ক্লাসি ছিলেন ৬০ বছর আগের সেকালের নায়িকা যেটা অবাক করে দেয়, বার বার প্রেমে পরতে বাধ্য করে। এই মেলোড্রামাটিক গল্পে তার এক চরিত্র দিয়ে যেনো পুরো একটা গ্রামীণ সমাজের হাজার নারীর গল্প বললেন সুপ্রিয়া চৌধুরী। শংকর চরিত্রে অনিল চৌধুরীরও সেকি অসাধারণ চোখের যাঁদু। কথায় কথায় মানুষকে ইডিয়ট বলা লোকটাও সমাজের অনেকের চোখে ইডিয়ট হয়ে বাঁচতে না চাওয়ার ক্ষোভে আক্রোশে গলা মেলে গান ধরলেই মনে হয় প্রকৃতির বুকে এমন কোনো শান্তি এলো যা প্রাচ্যের দুঃখ,গ্লানী সব গ্রাস করে নিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের মায়ের ভূমিকায় গীতা দে’র অভিনয় দেখে মনে হতে পারে এ কেমন মা! কিন্তু, ওখানেই তো তার অভিনয়ের স্বার্থকতা।

বাংলা চলচ্চিত্রের এই কালজয়ী চলচ্চিত্র উপমহাদেশ সহ ইউরোপ, আমেরিকা সব যায়গাতেই মাত করেছে এবং প্রশংসিত হয়েছে চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের ভাষাতেও। এমন সিনেমাকে নাম্বার দিয়ে প্রকাশ করা যায় না তবুও নাম্বার দিতে হয়। আইএমডিবিতে “মেঘে ঢাকা তারা” প্রায় আড়াই হাজার ভোটে ১০ এ ৮ রেটিং নিয়ে আছে। রোটেন টম্যাটোজের মতে চলচ্চিত্রটি ৮৮ শতাংশ টাটক এবং গুগল অডিয়েন্স রেটিং ৫ এর মধ্যে ৪.৭। গুগল ইউজারদের মধ্যে এই চলচ্চিত্রকে পছন্দের তালিকায় রেখেছেন ৯৫ শতাংশ দর্শক।