52 / 100

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে শক্তিমান অভিনয়শিল্পীর তালিকায় তিনি থাকবেন সর্বাগ্রে। কোন ধাঁচের চলচ্চিত্রে নেই তিনি? ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, নাট্যধর্মী, লোককাহিনীভিত্তিক, পোশাকি ফ্যান্টাসি, সাহিত্যনির্ভর, শিশুতোষ, পারিবারিক মেলোড্রামা, বক্তব্যধর্মী সব চলচ্চিত্রেই তাঁর শীর্ষস্থান।

‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্র দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু। সালাউদ্দীনের”সূর্যস্নান” চলচ্চিত্রে অভিনয় দিয়ে সামনে এলেন। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলো জহির রায়হানের বিখ্যাত “কাচের দেয়াল” চলচ্চিত্র। যে চলচ্চিত্রের অনন্য শক্তিমান অভিনয়ে জানান দিলো বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন নবাবের আগমন ঘটেছে।

১৯৬৩ তে মুক্তি পেল নাচঘর চলচ্চিত্র, ৬৪ আর ৬৫ সালে যথাক্রমে বন্ধন ও একালের রূপকথা চলচ্চিত্র আর ১৯৬৬ সালে দুই দিগন্ত চলচ্চিত্রে তাঁর অসামান্য অভিনয়।

১৯৬৭তে মুক্তি পেল বিখ্যাত চলচ্চিত্র নবাব সিরাজউদ্দৌলা। যে চলচ্চিত্রে নবাব সিরাজউদ্দৌলা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আনোয়ার হোসেন। সেই চলচ্চিত্র যে একবার দেখেছেন তিনিই স্বীকার করতে বাধ্য বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে মুকুট হীন সম্রাট একজনই। এই চলচ্চিত্রে আনোয়ার হোসেন পেয়েছিলেন পাকিস্তানে চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত নিগার পুরস্কার।

১৯৬৮ সালে মুক্তি পেল সাত ভাই চম্পা চলচ্চিত্র। সুলেমানপুরের বাদশাহ চরিত্রে আনোয়ার হোসেনের অভিনয় যে একবার দেখেছে তাঁর পক্ষে ভোলা সম্ভব না।

১৯৭০ এ মুক্তি পেল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্র। যে চলচ্চিত্রে আনোয়ার হোসেন অভিনয় করেছিলেন সচেতন জনপ্রিয় এক রাজনৈতিক নেতার চরিত্রে। মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর মুক্তি পেল সুভাষ দত্তের বিখ্যাত চলচ্চিত্র অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী চলচ্চিত্র।

সেই চলচ্চিত্রের দৃশ্যে দেখা যায় এক প্রত্যন্ত গ্রামে আসে চলচ্চিত্র শুটিংয়ের দল। চলচ্চিত্রের নায়ক আনোয়ার হোসেন। সিনেমার শুটিং দেখতে ভিড় করে রোমেনা, আসাদ ও গ্রামের অনেকেই। সেখানে অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে আলাপ হয় রোমেনা ও আসাদের।

এদিকে পঁচিশে মার্চ রাত থেকে শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ। গণহত্যার স্থির চিত্র দেখা যায়। রোমেনাদের বাড়িতেও ঘাতকরা আসে।রোমেনাকে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। হত্যা করে তার বাবা মাকে।কৃষক বদরুদ্দিনসহ আরো অনেক তরুণ মুক্তিযোদ্ধা হয়। শরণার্থীরা দলে দলে ছুটে যায় ভারতীয় সীমান্তের দিকে। পথে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে আশ্রয় নেন ঝোঁপের আড়ালে। সেখানে দেখা হয় আবার রোমেনার সঙ্গে। বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে এসে আত্মহত্যা করতে চায় রোমেনা। তার আগে দুজনেই ধরা পড়েন, বন্দি হন।

বন্দি অবস্থায় আনোয়ার হোসেন দেখেন কি নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছে বাঙালি নারীদের উপর। হত্যা করা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের। গ্রাম থেকে ধরে আনা সাধারণ মানুষ যারা যুদ্ধে জড়িত নয়, তাদেরকেও নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। মৃত্যুভয়ে চরম ভীত হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু চলচ্চিত্র নায়ক হওয়ায় এবং নিরীহ ব্যক্তি মনে করে তাকে ছেড়ে দেয় পাকিস্তানি সেনা কর্মকতর্া। ছাড়া পেয়ে আশ্রয়ের খোঁজে হাঁটতে থাকেন ক্লান্ত বিধ্বস্ত চিত্রনায়ক। দেখা হয় একদল মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে। তারও ইচ্ছা হয় যুদ্ধে যাবার। কিন্তু তার পরেই মৃত্যুর ভয় গ্রাস করে তাকে। তিনি যুদ্ধে যেতে পারেন না। তিনি উপলব্ধি করেন সিনেমায় বীরত্বের অভিনয় করা সহজ। কিন্তু বাস্তব জীবনে বীর হওয়া এত সহজ নয়। কি অসামান্য অভিনয় আনোয়ার হোসেনের। তা ভোলা সম্ভব না।

এর পরের বছর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র আলমগীর কবিরের “ধীরে বহে মেঘনা”।

৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া আরেক বিখ্যাত চলচ্চিত্র লাঠিয়ালের কথা বলতেই হয়। এই চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেননারায়ণ ঘোষ মিতা ।‌ কাদের লাঠিয়াল চরিত্রে কি অনন্য অভিনয় আনোয়ার হোসেনের।

১৯৭৭ সালে মুক্তি পেল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের আরেক অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র রূপালী সৈকতে চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রে আনোয়ার হোসেন অভিনয় করেছিলেন চরিত্রে। এই চলচ্চিত্রে আনোয়ার হোসেন অভিনয় করেছিলেন স্বনামেই অর্থাৎ আনোয়ার হোসেন চরিত্রে।

৭৭ সালে মুক্তি পেল আমজাদ হোসেনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র নয়নমনি। নয়নমণি চলচ্চিত্রে “নইমুদ্দী” চরিত্রে আনোয়ার হোসেনের অসামান্য অভিনয়।

৭৮ সালে মুক্তি পেল বিখ্যাত চলচ্চিত্র গোলাপী এখন ট্রেনে। ববিতার বাবা অর্থাৎ গোলাপীর বাবা চরিত্রে আনোয়ার হোসেনের অভিনয় আজো চোখে ভাসে। অভিনয় কখনোই মনে হয়নি, বারবার মনে হয়েছে এ তো বাস্তবেই তিনি চলছেন।

৮৪ সালে আমজাদ হোসেনেরই আরেক বিখ্যাত চলচ্চিত্র ভাত দে। এই চলচ্চিত্র ছিলো কানে প্রথম প্রদর্শিত চলচ্চিত্র। সাইজুদ্দিন বয়াতি চরিত্রে আনোয়ার হোসেন অভিনয় করেছিলেন। সেই চলচ্চিত্রে আনোয়ার হোসেনের অভিনয় ও ছিলো মাস্টারক্লাস। আমজাদ হোসেনের শ্রেষ্ঠ তিন চলচ্চিত্রের প্রতিটিতেই আনোয়ার হোসেন ছিলেন।

চলচ্চিত্রে চরিত্রের প্রয়োজনে কখনো ভেঙ্গেছেন কখনো গড়েছেন। আনোয়ার হোসেন যেন এক অষ্টধাতুতে গড়া এক প্রবাদপ্রতিম চরিত্র। .নিজের অভিনয় জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন “বালকবেলায় স্কুলের নাটকে অভিনয় করতে গিয়েই অভিনয়ের প্রতি আমার আসক্তি। এরপর তখনকার রূপালী জগতের তারকা ছবি বিশ্বাস, কাননদেবী এদের বিভিন্ন ছবি দেখতে দেখতেই রূপালী জগতে আসার ইচ্ছাটি প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে ওঠে। পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকে সিদ্ধান্ত নিলাম অভিনয় করবো সারাজীবন।”

বাংলাদেশে অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে তিনিই প্রথম একুশে পদক পান। ১৯৮৮ সালে। আজ আনোয়ার হোসেনের জন্মদিন। বিনম্র শ্রদ্ধা এই প্রবাদপ্রতিম কিংবদন্তির প্রতি। ❤️