70 / 100

কালচারাল স্টাডিজের স্টুডেন্ট হওয়ায় ২-১ টা ক্লাসিক চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করার সুযোগ হয়েছে, সুযোগ হয়েছে না বলে বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে বললেই সত্যটা বলা হবে । কিন্তু পরিক্ষায় নাম্বার পাওয়ার জন্য শিখতে গিয়ে যে এর প্রতি একটু আগ্রহ তৈরি হয়েছে তা বলতেই হয়। তবে কালচারাল স্টাডিজে পড়া বাদেই যে আমার বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র দেখার আকাঙ্ক্ষা ছিলোনা তা বলা ভুল হবে । চলচ্চিত্রের প্রতি এই ভালোবাসার কারণেই হোক আর যে কারণেই হোক আজ প্রথম একটা বাংলাদেশি (মেঘের অনেক রং) চলচ্চিত্রের বিষয়ে আমার ব্যাক্তিগত বিশ্লেষণ লিখতে বসলাম ।


মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যতগুলো বাংলা চলচ্চিত্র আছে তারমধ্যে আমার মতে সবচেয়ে আন্ডাররেটেড হচ্ছে মেঘের অনেক রঙ । কেন এমনটা বলছি তা সম্পূর্ণ বিশ্লেষণটি পড়লেই বুঝতে পারবেন । যদিও প্রায় সবগুলো চরিত্রেই নতুন মুখ ছিল চলচ্চিত্রটি দেখার পর তাদের অভিনয় দক্ষতা নিয়ে আপনার কোন সংশয় থাকবেনা । বাংলাদেশি ছবিতে অবাঙালি প্রোটাগনিস্ট আর আছে কিনা আমার জানা নেই , কিন্তু এই ছবির বিশিষ্ট হয়ে উঠার অন্যতম কারণ হচ্ছে যে এটি সম্ভবত মেইনস্ট্রিম বাংলা চলচ্চিত্রের একমাত্র আধুনিক বা উত্তর আধুনিক সংস্করণ যেখানে অন্যতম প্রধান চরিত্রটি বাঙালি নয় ।

প্রথমেই বলি ছবিটি দেখার সময় আমাদের মাথায় রাখতে হবে এর নির্মাণ কাল এবং এর সমসাময়িক বাংলাদেশি সামাজিক মূল্যবোধ কেমন ছিল , বাংলাদেশি চলচ্চিত্র কেমন ছিল ইত্যাদি । ১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া এ ছবির সত্যি প্রশংসা করতে হয় কারণ তখন বাংলাদেশি চলচ্চিত্র যে মাত্র শৈশবে পা রেখেছে তা বাংলাদেশের বয়সের দিকে নজর দিলেই পরিস্কার হয় । পরিচালক হারুনর রশিদের নিজের লেখা গল্পে ছবিটি নির্মাণ করেন । গল্পটি অবশ্যই অন্যসব ছবির গল্পের থেকে ব্যতিক্রম এবং গল্পের মধ্যে একধরণের স্বকীয়তা আছে , আর গল্পটি যে দারুণ তা আর আমার বলে দেয়া লাগবে না; ছবিটি দেখলে আপনারাই বুঝতে পারবেন গল্পটি কেমন ।


ওমর এলাহি এবং মাথিনের অনন্য অভিনয় শৈলী সাথে ‘দিপু নাম্বার টু’ ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা দিপুর চেহারার সাথে হুবহু মিল থাকা মাস্টার আদনানের চতুর, মায়াময় অভিনয় আপনাকে মুগ্ধ করবে । মজার কথা হল যখন আমি প্রথমবার ‘মেঘের অনেক রঙ’ দেখি, আমি শতভাগ ধরেই নিয়েছিলাম যে ছবিতে আদনান চরিত্রে অভিনয় করা বাচ্চাটিই পরবর্তীতে ‘দিপু নাম্বার টু’য়ে অভিনয় করেছিলো, কিন্তু ভুল ভাংলো যখন দেখলাম এ ছবি দুটির নির্মাণকালের কালের মধ্যে তফাৎ ২০ বছরের । ২০ বছরে তো কেও আর ১০ বছরের বড় হতে পারেনা শুধুমাত্র যদিনা তার অর্ধ-বাড়ন্ত সিনড্রোম থেকে থাকে । যাইহোক, বিষয়টা পরিস্কার করে বলে দিই এবার , দিপু নাম্বার টু এর দিপু আর মেঘের অনেক রঙের আদনান একজন অভিনেতা নন, যদিও তাদের চেহারার সাদৃশ্য অবাক করার মত ।


এই ছবির যে ব্যাপারটিতে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে মুগ্ধ তা হল এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক । খুব দক্ষ হাতে এই ছবিতে শব্দের কাজ করেছেন বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের কিংবদন্তী ফেরদৌসি রহমান , আমরা তাকে ফেরদৌসি বেগম হিসেবেও চিনে থাকি । কোন সিনের সাথে কোন ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে হবে তা তিনি খুব ভালো জানেন এবং তারই প্রতিফলন আমরা দেখি এই ছবিতে । কিছু ব্যাপারে হয়তো অনেকের অতিপ্রয়োগ মনে হতে পারে কিন্তু আবারো বলছি মাথায় রাখতে হবে এটি কবেকার চলচ্চিত্র এবং সে সময়ের বাংলা চলচ্চিত্র কেমন ছিল ।


তারপর আসি ক্যামেরার ব্যাপারে , সেই ছিয়াত্তোর সালেই যে ক্যামেরা নিয়ে এমন কন্সেপচুয়ালি কাজ করা যায় তা এ ছবিটি না দেখলে আমার বিশ্বাস হতো না । ইউটিউবে দেখাতে হয়তো লাইট এবং স্ক্রিনিং এর কিছু ব্যাপার মিস করে গেছি কিন্তু যতটুকু পাওয়া গেছে তাতেই আমি সত্যি অবাক । এছাড়া কিভাবে কালচারাল কিছু বিষয় যেমন, পাহাড়ি মানুষের ঐতিহ্য বহন করে এমন অনুষ্ঠান এবং অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদির এতো ডিটেইল প্রেজেন্টেশন সত্যি আমি অন্য কোন বাংলা ছবিতে দেখিনি, দেখলেও তা যে অপ্রতুল তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই ।


বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন ডাক্তারের পোস্ট হয় পাহাড়ে , সেখানে থাকা অবস্থায় তার স্ত্রীকে পাকিস্তানী বাহিনী ধর্ষণ করে এবং পরে তার স্ত্রী বাচ্চাসহ দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকায় ডাক্তার ধরেই নেন যে তারা মারা গেছে । এরমধ্যে ডাক্তারের জীবনের দুঃখের সঙ্গী হতে আসেন তার হাসপাতালের নার্স যিনি পাহাড়ি । তাদের মধ্যে খুব ভালই চলছিলো কিন্তু যেদিন ডাক্তার কে দূর থেকে দেখে একজন বীরাঙ্গনা চিনে ফেলেন যে ইনি তার স্বামী , কিন্তু সমাজের কলঙ্কের ভয়ে অথবা অন্য কোন কারণেই হোক তিনি ডাক্তারের সামনে পরতে চাইলেন না সেদিন থেকেই আসলে এই ছবিতে দন্ধ বা কনফ্লিক্টের শুরু । এরপরেই আদনান নামক চরিত্রের মিষ্টি অভিনয় এবং মন ভুলানো ভাবে সংলাপ আপনাকে আনন্দ দিতে বাধ্য । পরবর্তীতে কি হল না হল তা জানতে ছবিটি দেখতে হবে আপনাদের ।

অনেক রং উইকিপিডিয়া
উইকিপিডিয়া


ছবিটি ৫ টি ভিন্ন বিভাগে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার পরো কেন আমি বলছি এটি আন্ডাররেটেড ? কারণ , এমন একটি চমৎকার চলিচ্চিত্র সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানিনা । মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য চলচ্চিত্র গুলো যতটা প্রচার প্রচারণা পেয়েছে তার অনেক অংশ থেকেই মেঘের অনেক রঙ বঞ্চিত হয়েছে । এতো ভালো একটি চলচ্চিত্র নিয়ে যতটুকু আলোচনা , সমালোচনা হবার কথা ছিলো ততটুকু হয়নি । কেন হয়নি তার অনেকগুলো ব্যাক্ষা দাড় করানো যায় কিন্তু আমি সেদিকে যাচ্ছিনা । আমি ব্যাক্তিগত ভাবে চাই বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম এই ছবিটি দেখুক এবং দেখার পর এর থেকে কি শেখা যায় অথবা আদৌ কিছু শেখা যায় কিনা সেটি তাদের ব্যাক্তিগত সিদ্ধান্ত । এমন একটি ছবি প্রত্যেকটি নির্মাতারও দেখা উচিত বলে আমি মনে করি তাতে করে তাদের নির্মাণেও কিছু প্রভাব পরতে পারে ।

ছবিটির আইএমডিবি চেক করে দেখলাম ৮.৬ কিন্তু আমার ব্যাক্তিগত রেটিং ৯। আমি ইউটিউবে দেখেছি অন্য কোন সূত্র থেকে নামিয়ে দেখতে পারলে কোয়ালিটি ভালো হতে পারে, কিন্তু এটি এমন একটি ছবি যেখানে গল্প , নির্মাণ আর অভিনয় দক্ষতা একসাথে মিলে এর রিপ্রেজেন্টেশনকে ছাপিয়ে গিয়েছে কয়েকগুণ । আমার রিভিউ ( এটা কে রিভিউ বলা যাবে কিনা জানি না, বিশ্লেষণ বলাটাই মনে হয় সংগত হবে) পড়ে একজন ও যদি ছবিটি দেখে তবেই আমার উদ্দেশ্য সফল হবে, আর যদি ভুলক্রমে কেউ পছন্দ করে ফেলে তবে তো সোনায় সোহাগা।
লেখার ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন ।

লেখক: Motasim Himu, চলচ্চিত্র সমালোচক