73 / 100

প্রথমেই বলে নেয়া ভালো আমি মনে প্রাণে চাই ‘মাসুদ রানা’ বা ‘MR-9’ মুভিটি কোনোভাবেই যেন ফ্লপ না করে। একজন বাংলাদেশি হিসেবে, একজন বাংলা ছবির দর্শক হিসেবে আমি সবসময় প্রত্যাশা করি আমাদের বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নাম করুক, সসম্মানে স্থান করে নিক বিশ্ব চলচ্চিত্রের বুকে।

১. কাহিনী:

মূল কথায় আসি। আমার যে ৫ টি কারণে মনে হয় মাসুদ রানা মুভিটি ফ্লপ করতে পারে তার প্রথমটি হলো ছবির কাহিনী।যারা মাসুদ রানা সিরিজের গল্পগুলো পড়েছেন তারা সকলেই কম বেশি জানেন যে, মাসুদ রানা চরিত্রটি হলিউডের জেমস বন্ড চরিত্রের আদলে তৈরি। বিষয়টি হচ্ছে অরিজিনালিটির, এক্সিকিউশন এবং রিলেট করতে পারার। মাসুদ রানা নামটি বাংলাদেশি হলেও এর ঘটনা প্রবাহ স্বতন্ত্র বাঙ্গালীয়ানা নয়। টেকনোলোজির যুগে মানুষ এখন এক ক্লিকেই পৃথিবীর যেকোনো স্থানের যেকোনো মুভি দেখতে পারে। স্পাই থ্রিলার বা জেমস বন্ডের মত ক্যারেক্টার বা কাহিনী দেখার জন্য আমি জেমস বন্ড বা হলিউডের এ জাতীয় মুভিই যেখানে পাচ্ছি সেখানে গরীবের জেমস বন্ড মাসুদ রানা (!?) আমি কেন দেখব?আপনি বলতে পারেন, এরকম এডাপ্ট করা চরিত্র বা কাহিনী নিয়ে কেউ কী আগে মুভি বানায়নি? অবশ্যই বানিয়েছে। আপনি খেয়াল করে দেখবেন পাশের দেশ ভারতে এরকম বহু সিনেমা আছে যা হলিউডের কোনো ছবি, চরিত্র বা গল্প থেকে ইন্সপায়ারড। তবে এখানে কিছু বিষয় আছে৷ এডাপ্ট করা যেসব সিনেমা বলিউডে হিট করেছে সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কাহিনী বা চরিত্র এডাপ্ট করা হলেও সিনেমা গুলোর প্লট ১০০% স্বদেশী। এমনকি আপনি যদি না জেনে থাকেন যে, এই ছবি এডাপ্ট করা আপনি বুঝবেনই না যে এর কাহিনী আসলে অরিজিনাল না। এরকম কিছু ছবি: মকবুল, ওমকারা, হায়দার ইত্যাদি।

হবেন মাসুদ রানা 1
কে হবেন মাসুদ রানা

২. স্টার-কাস্ট:

আপনি মানেন আর না মানেন, ওয়েস্টার্ন আর ওরিয়েন্টাল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এবং দর্শকের মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল।ওয়েস্টার্ন দর্শকদের কাছে ফিল্ম, কাহিনী, অভিনয় ইত্যাদি যতটা গুরুত্বপূর্ণ স্টার-কাস্ট অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। পক্ষান্তরে, আমাদের সাব কন্টিনেন্টাল দর্শকদের কাছে স্টার-কাস্ট বড় একটি বিষয়। মাসুদ রানায় স্টার-কাস্টের অভাব ছবিটি ফ্লপ করার একটি বড় কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ মানে শুধু ঢাকা নয়। ঢাকার বাইরের দর্শক বাংলা ছবির নায়ক-নায়িকা হিসেবে যাদেরকে চেনে তারা মাসুদ রানাতে নেই। যারা আছে তারা মোটামুটি সবাই নবাগত। নবাগত শিল্পীদের নিয়ে কাজ করা সব সময়ই রিস্কি। কারণ দর্শক গ্রহণ করবে কি করবে না তা বলা যায় না এবং বেশিরভাগ সময়ই দর্শক গ্রহণ করে না।

৩. বাজেট:

আমি বিভিন্ন পত্রিকা মারফত জেনেছি সিনেমাটির বাজেট ৮০ কোটি টাকার মতন। আমার ধারণা মতে আমাদের বর্তমান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি মার্কেট আসলে এতো বড় নয়। এতোগুলো উন্নতমানে প্রেক্ষাগৃহ বা হল-ই নেই যা থেকে এতো বিগ বাজেটের মুভির কস্ট বা ব্যয় তুলে আবার প্রফিটও করতে পারে। একটা বড় খাত হতে পারে দেশের বাইরে ফিল্মটির রিলিজ। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়াতে যদি দেখি, যারা কিনা বেশ আগে থেকেই তাদের ছবি দেশের বাইরে রিলিজ করে থাকে, সেখানে মূল টাকা কিন্তু দেশের ভেতর থেকেই ওঠে দেশের বাইরে থেকে হয়ত দেশে যা কালেকশন হয় তার ৫০% বা আরেকটু বেশি ওঠে।এখানে দেখার বিষয় সিনেমাটির গল্প কেমন হয় বা বাইরের দর্শকদের কাছে গল্পটি কেমন লাগে। বলিউডের দাঙ্গাল বা থ্রি ইডিয়টস দেশের বাইরেও ভালো ব্যবসা করেছে তার কারণ ফ্রেশ কাহিনী। এমন গল্প যা বিদেশি দর্শকদের কাছে নতুন লেগেছে। আমাদের মাসুদ রানার প্লট কিছুটা দেশি, চরিত্র গুলো বাংলাদেশী কিন্তু কাহিনী কিন্তু নতুন নয়। যারা জেমস বন্ডের দর্শক তারা কম্পেয়ার করবেই এবং ধরেই নেয়া যায় বাজেট, মেকিং বা অভিনয় স্কিলে আমাদের মাসুদ রানা কখনই জেমস বন্ডকে বিট করতে পারবে না, এজ এ রেজাল্ট দেশের বাইরেও মাসুদ রানা যে খুবই জনপ্রিয় হবে এ আশা করা অলীক।

মাসুদ রানা এবিএম সুমন
মাসুদ রানা এবিএম সুমন

৪. অভিনয়:

এ বি এম সুমনকে মাসুদ রানার লিড রোল দেয়া হয়েছে। ঢাকা অ্যাটাক ছবিতে উনার অভিনয় দেখেছি, খুব আহামরি কিছু না হলেও ঠিক ঠাক অভিনয় করেছেন। ফিমেল লিড হিসেবে যাকে নেয়া হয়েছে সে একেবারেই নতুন, এবং এসেছেন মডেলিং ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। উনি অভিনয় কেমন করবেন জানি না। তবে, আমার মনে হয় লিড রোল-এ যারা থাকেন সবাইকেই নেয়া উচিত অভিনয়ের এক্সপেরিয়েন্স আছে এমন জায়গা থেকে। আমরা এখনও পরে আছি ৯০ এর দশকে যেখানে সৌন্দর্যই প্রধান অভিনয় স্কিল থেকে। একজন ভাল অভিনেতা কী করতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ইরফান খান, নওয়াজুদ্দিনরা, পক্ষান্তরে একজন রূপ সর্বস্ব খারাপ অভিনেতা কী করতে পারে তার উদাহরণ টাইগার স্রফ, ইমরান খানেরা।

মাসুদ রানা সিনেমা নির্মাণ করবে জাজ মাল্টিমিডিয়া লিমিটেড
মাসুদ রানা সিনেমা নির্মাণ করবে জাজ মাল্টিমিডিয়া লিমিটেড

৫. বিগ হাইপ:

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যে চলচ্চিত্র গুলো অতিরিক্ত হাইপ তৈরি করে সেগুলো ঠিকমত বিজনেস করতে পারে না। এর প্রধান কারণ ‘হাই-এক্সপেকটেশন’। মাসুদ রানার এখনো শুটিং-ই শুরু হয়নি কিন্তু এই চলচ্চিত্র নিয়ে যেরকম হাইপ অলরেডি তৈরি হয়েছে, এই এক্সপেকটেশন পূরণ করা খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে।পরিশেষে, আবারও একটু প্লট নিয়ে কথা বলে শেষ করে দেই। যেকোনো দেশের ছবি কথা বলে সেই দেশকে নিয়ে, সেখানকার কালচার, ট্র্যাডিশন নিয়ে। মুভির কাহিনী হতে পারে যেকোনো দেশের বা আন্তর্জাতিক মানের কিন্তু প্রেক্ষাপট হতে হবে ১০০% দেশি, এছাড়া দর্শক রিলেট কখনই করতে পারবেনা। আমাদের দেশে হরর ফিল্ম হিসেবে ভ্যাম্পায়ার বা জোম্বি ফিল্ম খুব একটা ভালো করবে না, কিন্তু জীন বা মামদো ভুত কাজ করতে পারে। মাসুদ রানার কড়কড়া স্যুট-প্যান্টের চাইতে হিমুর হলুদ পাঞ্জাবি বেশি রিলেট করতে পারে আমাদের সাধারণ মানুষ। এর মানে কী আমাদের দেশে স্পাই থ্রিলার জনরার মুভি আমরা তৈরিই করতে পারবো না? অবশ্যই পারবো, কিন্তু তা হতে হবে আমাদের দেশের কৃষ্টি-কালচার ঘিরে। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা’র মেইন ইন্সপিরেশন কিন্তু শার্লক হোমস, কিন্তু ফেলুদা নিতান্তই যেন আমাদের লোক, তার একেকটা মিশন বা গল্প যেন একেবারেই আমাদের ভেতর থেকে নেয়া।

আমার এই লিখার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই মাসুদ রানা মুভির বিপক্ষে নেগেটিভ কিছু ছাড়ানো নয়, বরং আমি খুব করে চাই, আমার প্রেডিকশন গুলো ভুল প্রমাণ করে MR9 মুভি বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে রেভ্যুলুশন ঘটাক।

ধন্যবাদ সবাইকে।