51 / 100

গ্রিক মিথোলজির সিসিফাস দুইবার মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়েছিলেন। এর জন্য তাকে এক কঠিন শাস্তি পেতে হয়েছিল। একটা বিশালাকৃতির পাথরের গোল্লা কাঁধে নিয়ে তাকে পাহাড়ের চুড়ায় উঠতে হত, পাথরটা সেখান থেকে গড়িয়ে পড়ে গেলে আবার সেটাকে কাঁধে নিয়ে পাহাড়ের চুড়ায় উঠতে হত। এবং এটা চলবে অনন্তকাল ধরে। এটাই সিসিফাসের শাস্তি। এখনও সিসিফাস পাথর কাঁধে নিয়ে পাহাড়ের চুড়ায় উঠছেন, ভবিষ্যতেও উঠবেন। বিরামহীন। রিপিটেশন।

সিসিফাসের এই শাস্তিকে দার্শনিক আলবেয়ার ক্যামু মনুষ্যজীবনের সাথে তুলনা করেছিলেন। তার মতে, মানুষের জীবন-মৃত্যু, জীবনের কর্মকাণ্ডগুলো এমনই রিপিটেটিভ এবং অর্থহীন। আমরা সবাই সিসিফাস। জীবনের অর্থ বের করার লক্ষ্যে খাতা কলম নিয়ে বসলে সবাই কম-বেশি জীবনকে এমন অর্থহীন রিপিটেশন হিসেবেই দেখতে পায়।

ব্রহ্মাণ্ডে সবকিছুই চক্রাকারে চলে। প্রাণীদের জীবনচক্র, চন্দ্র-সূর্যের প্রদক্ষিণ চক্র, ধ্বংস-সৃষ্টির চক্র। মনুষ্যজীবনের সকল কর্মকাণ্ডও এই চক্রের তালে চলে। প্রতিদিন একই সূর্য দেখে ঘুম থেকে উঠা, একই কাজ, একই আবেগ, একই দুঃখ, একই সুখ, একই স্বাদ, একই বিষাদ, একই উত্থান আর একই পতনের এক চক্রের মধ্য দিয়েই যাপিত হয় একটা মনুষ্যজীবন। এমন জীবনের অর্থ কী?

যখন কোন কিছুর অর্থ থাকে, সেটার মাহাত্ম হল এটা কোন চক্রের মধ্যে পড়ে না। বুদ্ধিস্টরা এই চক্রকে দুঃখ হিসেবে চিহ্নিত করে, যেটাকে বলা হয় সামসারা এবং এই চক্র ভেঙে বের হওয়াকেই তারা বলে মুক্তি কিংবা নির্বাণ। যদিও নির্বাণে কোন অর্থ তৈরির লক্ষ্য থাকে না। ব্রহ্মাণ্ডের কিংবা মনুষ্যজীবনের অর্থ থাকুক আর না থাকুক, সবকিছুর এই রিপিটেশনে এক ধরণের নিরাপত্তা আছে, নিশ্চয়তা আছে। কারণ এখানে সবকিছুই বারবার ফিরে আসে। সূর্য ডুবে গেলে আবার উদয় হয়, সুখ চলে গেলে আবার ফিরে আসে, দুঃখ চলে গেলেও সেটা আবার ফিরে আসে। জীবন চলে গেলেও আবার ফিরে আসে (জীবন ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়)। এই রিপিটেশন অন্তহীন এবং যেহেতু অন্তহীন, সেহেতু এটা নিরাপদ।

মনুষ্যমন প্রচণ্ড রকমের নিরাপত্তাপ্রেমী। সবকিছুকে একটা স্থায়ী নিরাপত্তায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে সে জীবনভর অক্লান্ত পরিশ্রম করে। কিন্তু সত্যিই যদি কোন মানুষকে চিরস্থায়ী এক নিরাপত্তায় নিক্ষেপ করা হয়, তখন তার জন্য এর চেয়ে বড় বিভীষিকা বোধহয় আর কিছুই হবে না।

আর দশটা মানুষের মতই দুজন সঙ্গী একবার হাউজিং মার্কেটে একটা সুন্দর নিরাপদ বাড়ির সন্ধান করছিলেন। করতে করতে তারা এক ডেভেলাপমেন্ট সেলস রুমে এক সেলসম্যানের কথায় ভুলে গিয়ে একটা চমৎকার সুন্দর হাউজিং সোসাইটিতে একটা বাড়ি দেখতে যান। একটা পরিবারের আরাম-আয়েশ আর নিরাপত্তার জন্য যা যা দরকার তার সবই ঐ বাড়িতে আছে। মুগ্ধতা নিয়ে বাড়িটা দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে দুই সঙ্গী আবিস্কার করেন, সেলসম্যান লোকটা এখানে আর নেই। কিছুক্ষণ পর তারা দেখতে পান, এখানকার প্রতিটা বাড়িই দেখতে একই রকম, একই রং, একই সাইজ। শুধু নাম্বার দিয়ে আলাদা করা যায়। বাড়িগুলো সুন্দর গোছানো। এখানে শতশত বাড়ি, হাজারও হতে পারে কিংবা অসংখ্য। কিন্তু কোন বাড়িতেই কোন মানুষ নেই। এমন অদ্ভুত দৃশ্য দেখে তারা যখন গাড়ি নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে চান, দেখতে পান যে তারা একটা মেইজের মধ্যে ঘুরছেন। কিছুতেই এলাকা থেকে বের হতে পারছেন না। ঘুরেফিরে সেই একই বাড়ির সামনে এসে পড়ছেন। শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে তারা সেই বাড়িতে থেকে যান। প্রতিদিন নিয়ম করে কোথা থেকে যেন এখানে তাদের জন্য খাবার আসে, প্রয়োজনীয় সব দ্রব্যাদি আসে। একদিন একটা প্যাকেটে করে একটা বাচ্চাও আসে। নিরাপত্তার কোন কিছুই এখানে কমতি নেই। কিন্তু সঙ্গী দুজন এখান থেকে পালানোর জন্য পাগলপ্রায় হয়ে পড়েন। কারণ, এখানে অন্য মানুষ নেই, টানাপড়েন নেই, উত্তেজনা নেই, ভয় নেই, দুঃখ নেই, কর্ম নেই। এমন নিরাপত্তা কোন মনুষ্যমনই সহ্য করতে পারে না।

মনুষ্যমন আসলে নিরাপত্তা চায় না। সে কিছু একটা করতে চায়, কোথাও যেতে চায় – এমন পথে যে পথ ঘুরে আবার এখানেই যেন চলে না আসে। কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডে, রিয়্যালিটিতে, জীবনে – কোন কিছুই কোথাও যাচ্ছে না। শুধু ঘুরছে। এখান থেকে এখানেই। ফ্রেঞ্চ লেখক জন-ব্যাপটিজ অ্যালফঞ্জে কার একবার বলেছিলেন, “দ্যা মোর থিংস চেঞ্জ, দ্যা মোর দে রিমেইন দ্যা সেইম।”

লেখক- শরিফুল ইসলাম