82 / 100

আঠারো সালের দিকে ব্রেকিং ব্যাড প্রথম সিজনটা দেখেছিলাম। খারাপ বা ভালো কোনোটাই লাগেনি। গ্ল্যামারের অভাব ছিল। খুব ধীরে ধীরে কাহিনী সামনে আগাচ্ছিল। প্রথমের পুরো সিজনটাই এক হাইস্কুলের রসায়নের অধ্যাপক ওয়াল্টার হোয়াইট আর নেশাখোর গোল্লায় যাওয়া তরুণ জেসি পিঙ্কম্যানের এক অদ্ভুত সম্পর্কের রসায়ন। গটের মতো টানে নি। দেখা বাদ দিলাম।

দু’বছর পর এক অযাচিত অবসরে আবারো ব্রেকিং ব্যাড দেখা শুরু করলাম। এইবার অল্প অল্প আকর্ষণ করছিল কাহিনী। ধৈর্য ধরে দেখছিলাম। মাঝে মাঝে অবাক হচ্ছিলাম হলিউডে এতো বিশ্বাসযোগ্য নির্মাণ, এতো পরিমিতিবোধ কিভাবে সম্ভব! মূল গল্পটা অসাধারণ এবং সংক্ষিপ্ত। এক বাক্যে কাহিনী বলে দেওয়া যাবে। কিন্তু তারপরেও ঘন্টার পর ঘন্টা আপনি এরই চলচ্চিত্রায়ণ দেখে যাবেন। আমেরিকার এক পরিবারের প্রত্যেকদিনের জীবন-যাপন দেখে দেখে আপনার পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে একটা ধারণা হবে। আপনি বুঝবেন যে এমন একটা সমাজে ন্যূনতম একটা জীবনমান নিশ্চিত করতে কতো বিপুল পরিমাণে অর্থ ব্যয় করতে হয়। সে অর্থের জোগান দিতে গিয়ে একটা মধ্যবিত্ত পরিবারকে কীভাবে লড়াই করতে হয়।

ব্যাড Art
ব্রেকিং ব্যাড -এর পোস্টার

ব্রেকিং ব্যাড সিরিজের কাহিনীর বেশ কয়েকটা মাত্রা আছে। একদিকে এই সিরিজ চলমান ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলেছে, আবার একইসাথে এইটা একটা চমৎকার ড্রামা এবং রোমাঞ্চকর অপরাধ জগতের কাহিনী।

জনাব ওয়াল্টার হোয়াইট হলেন হাইস্কুলের একজন রসায়নের শিক্ষক। মধ্যবয়েসী একজন নির্বিবাদী মানুষ তিনি। বাস করেন আমেরিকার নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আলবেক্যুয়ের শহরে। সাড়ে তিনজনের একটা পরিবার আছে তার। বউ স্কাইলারের পেটে আছে তার কন্যা হলি। তার বড় ছেলে ফ্লিনকে স্ট্রেচারে করে হাঁটতে হয়, কথাবার্তায় জড়তা আছে তার। মাষ্টারি করে খুব বেশি অর্থ জমাতে পারেন নি স্বাভাবিকভাবেই। এর মধ্যেই তার ফুসফুসের ক্যান্সার ধরা পড়ে। কাশতে কাশতে রক্ত উঠে যায় মুখ দিয়ে। কিন্তু তাতে কী? ক্যান্সারের ব্যয়বহুল চিকিৎসা করাতে তিনি চান না। তিনি জানেন তার হাতে খুব বেশি সময় নাই। এইভাবে মরে গেলে তার পরিবারের কী হবে? গর্ভবতী স্ত্রী আর প্রতিবন্ধী সন্তানকে বিশাল বিপদের মুখে ফেলে যেতে তিনি চান না। তিনি না থাকলে সন্তানদের বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, জীবন-যাপন সবমিলিয়ে একটা পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জোগান কে দেবে?

ব্যাড এর পোস্টার
ব্রেকিং ব্যাড এর দৃশ্য

এইসব দুশ্চিন্তা ছাড়াও তার আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা আছে। সারাজীবন নির্বিবাদী ভাল মানুষ ভদ্রলোক হয়ে মুখ বুঁজে জীবন কাটিয়েছেন। জীবনের শেষ কিছু সময়ে নিজেকে একটু আলাদাভাবে আবিষ্কার করতে চান তিনি। সবসময় নিজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো তার হয়ে অন্য কেউ নিয়েছে। শেষ সময়ে হলেও নিজের জীবনের কর্তৃত্ব নিজের হাতে নিতে চান তিনি।

সে থেকে শুরু হয় তার ‘মিস্টার হাইড’ হয়ে উঠার পালা। নিজের ভেতরে অন্য এক ওয়াল্টার হোয়াইটের জন্ম দেন। খালি হাতে বুকে সাহস আর মাথায় বুদ্ধি নিয়ে এক বিপজ্জনক অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন। সেখানে তাকে এমন সব রোমাঞ্চের সাথে বোঝাপড়া করতে হয় যা কোনো গড়পড়তা আমেরিকানের কাছে অভাবনীয়।

কাটখোট্টা বিষয় রসায়নের একজন মাষ্টারমাইন্ড একসময় আবিষ্কার করেন সম্পর্কের জটিলতার কাছে সবকিছু হার মানে। একজন রসায়নবিদ, একজন স্বামী, একজন পিতা এবং একজন ‘পার্টনার’ হিসেবে বেশ কয়েকটা ভ্রমণ আছে তার।

ব্রেকিং ব্যাড সিরিজ © Watch Mojo

ব্রেকিং ব্যাড সিরিজ দেখা মানে একটা গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাওয়া। নির্মাতা দর্শককে যথেষ্ট সমীহ করেছেন। জনপ্রিয় ধারার নির্মাতারা দর্শককে মাথামোটা ধরে নিয়ে কোনো একটা কনটেন্ট তৈরি করে থাকেন। সবকিছুকে এতো বেশি তরলীকরণ করে গুলিয়ে খাইয়ে দেন যে আপনি যদি সংবেদনশীল দর্শক হন তাহলে সেটা আপনার আত্মসম্মানে লাগতে পারে। সেই দিক দিয়ে দেখলে ব্রেকিং ব্যাড একটা দুর্লভ নির্মাণ। মাঝে মাঝে তো মনে হয় নির্মাতা ভিন্স গিলিগানের উপর আব্বাস কিয়ারোস্তামি ভর করেছেন। এতো বেশি বাস্তবসম্মত নির্মাণ যে মাঝে মাঝে বিরক্তি আসে। মনে হয় বুকের উপর উঠে যাচ্ছে। এতো কষ্ট করে দেখতে হবে না, বাদ দিই। পরে সম্ভবত নিজের সিনেমা দর্শন কাজ করে অবচেতনে। শুধু সস্তা বিনোদন নেওয়া কিংবা সময় কাটানোর জন্য তো আর সিনেমা-সিরিজ দেখা হয় না! এক ধরণের বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জন, মন আর চিন্তার খোরাক। সেটা আনন্দদায়ক বা বিশেষ অর্থে বিরক্তিকর সবরকমই হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ব্রেকিং ব্যাড সিরিজে সুফল পাওয়া গেছে ।

প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আছে ব্রেকিং ব্যাড সিরিজে। তাদের আলাদা আলাদা ভ্রমণ আর পরিণতিও আছে। এত যত্ন করে বানানো সিরিজ খুব বেশি নাই মনে হয়। টিভি ও ওয়েব সিরিজের ইতিহাসে এ পর্যন্ত সবচেয়ে প্রশংসিত এবং সমালোচক নন্দিত সিরিজ দেখে শেষ করলাম।

লেখক: জাকির হোসেন, চলচ্চিত্র সমালোচক