80 / 100

ময়ুর নাচ শেখার অপরাধে মনসা দেবী বেহুলাকে অভিশাপ দেয় বাসর রাতে সিদূর হারা হবে সে, কাল নাগের বিষে প্রাণ যাবে পতির। মনসা সাপের দেবী জগতের সব সাপ মনসার হুকুম তামিল করে। আর ময়ুর সাপ খেয়ে ফেলে। তাই ময়ুর দূই চোখের বিষ মনসার নিকট।

চাঁদ সওদাগর মনসা দেবীকে ঘৃনা করে। তার পাঁচ পুত্র সাপের কামড়ে পৃথিবী ছেড়েছে। পুত্র বিধুরা হয়েছে স্বামীহারা। শেষ ছেলে লখিন্দর। সে ময়ুর ভালোবাসে পোষে।

সাই সওদাগরের একমাত্র আদরে মেয়ে বেহুলা। তার বিয়ের কথা চলছে। একদিন লখিন্দর সাই সওদাগরের রাজ্যে ময়ুর নিয়ে চলে আসে। সাই সওদাগর মনসা দেবীর পুজা করে। পুরো রাজ্য মা মনসার নামে কাতর সে রাজ্যে ময়ুর সাথে নিয়ে যুবক প্রবেশ করায় সবাই অবাক হয়। ময়ুর একটা সাপকে মেরেও ফেলে। এ খবর সাই সওদাগরের কানেও যেমন যায় স্বর্গে মনসার নিকটও যায়। সাই সওদাগর লখিন্দর কে ডেকে পাঠায় বিচারের জন্য তার রাজ্যে সাপ হত্যা মহা অন্যায় ময়ুর পোষা নিষিদ্ধ। কিন্তু চাঁদ সওদাগরের ছেলে লখিন্দর এটা জানার পর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। চাদ সওদাগর সাই সওদাগরের পুরনো বন্ধু। তার ছেলে লখিন্দরের সাথেই বেহুলার বিয়ের কথা দেয়া হয়ে আছে অনেক আগেই।

লখিন্দর বেহুলাকে ময়ুর নাচ শেখায়। আর বেহুলা এসে মনসাকে অভিশাপ দিয়ে যায়। মনসা লখিন্দর বেহুলার বিয়ে কোন ভাবেই হতে দেবেনা। বেহুলাকে অসতি প্রমাণ করার জন্য অভিশাপ মুক্তির কথা বলে রাত দ্বি প্রহরে শ্মশান ঘাটে নিয়ে মুখে অমৃত সুধার বদলে সুরা ঢেলে দেয়। রাতভর শ্মশান ঘাটে পরে থাকে সে।

সুপারহিট-সিনেমা-বেহুলার-হাতে-আঁকা-পোস্টার
সুপারহিট সিনেমা বেহুলার হাতে আঁকা পোস্টার

অগ্নী পরীক্ষায় বেহুলার বিজয়ের পর সিদ্ধান্ত হয়ে বিয়ে হবে বেহুলা লখিন্দরের। বাসর হবে লোহার বাসর ঘরে। যাতে বাসর রাতে সাপ যাতে কাটতে না পারে। লোহার বাসর ঘর বানানো হয়। কোন সুই ছিদ্রও যাতে না থাকে সেজন্য ধুয়া দিয়ে পরীক্ষা করাও হয়। কিন্তুু মনসা বংশ নির্ববংশ করার ভয় দেখিয়ে বাসর ঘরের কারিগরকে দিয়ে বিয়ের আগের দিন লোহার ঘরে ছিদ্র করিয়ে নেয়। সেই ছিদ্র দিয়ে কাল নাগ ঢুকে পড়ে। লখিন্দর ঘুমিয়ে থাকে বেহুলা থাকে পাহারায়। নিশ্ছিদ্র বন্দী লোহার বাসর ঘরে কাল নাগ দেখে বেহুলার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। কালনাগ লখিন্দরকে কেটে পালায়। চাদ সওদাগর শেষ সন্তান লখিন্দরকে হারায়। আর বেহুলা হারায় স্বামীকে। স্বৈরাচারী বিজয়ের হাসি হাসে মনসা স্বর্গে বসে। বেহুলার ঘর স্বপ্ন ভাংতে পেরে।

জলে ভাসিয়ে দেয়া হয় লখিনকে। কলার ভেলায়। যদি জলের গুণে ফিরে পায় লখিন তার প্রাণ। আশা ফুরায় না বেহুলার। লখিনকে নিয়ে ভাসতে থাকে নদীর জলে। দিন যায় রাত হয়। মাস বছর সবাই পাড় হয়। লখিন্দর পচে গলে শুধু কংকাল থাকে তার।

অবশেষে ইন্দ্রপুরীর এক নারীর সহায়তায় স্বর্গে দেবরাজ ইন্দ্রের দরবারে হাজির হয় বেহুলা। এ কেমন বিচার তাদের। তার স্বামীকে কেন কেড়ে নেয়া হল। ইন্দ্রপুরীর সব দেবতা রুষ্ট হয়ে তাদের প্রতি কেন তারা মনসার পুজো করেনা।

বেহুলা ইন্দ্রের সামনেই সাফ জবাব দেয়। পুজো কি জোর করে পাওয়া যায়, কেউ যদি ভালনাবেসে পুজো না দেয় সেখানে কি জোর করা যায়? পুজো বন্দেগী না পেলে কি তার ক্ষতি করা যায়। কেমন দেবী সে?

অবশেষে দেবতারা লখিনের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে রাজি হয় শর্তে। যদি বেহুলা দেবতাদের মন জয় করতে পারে তবেই সে ফেরত পাবে স্বামীর প্রাণ। বেহুলা রাজিও হয়। যে নাচের কারণে স্বামীর প্রাণ গেছে লখিন্দরের শেখানো সেই ময়ুর নাচ নেচেই ইন্দ্রপুরীর দেবতাদের মন জয় করে ফিরিয়ে নিয়ে আসে লখিন্দরের প্রাণ।

এটা ১৯৬৬ সালে নির্মিত জহির রায়হানের হ্যাপি এন্ডিং সিনেমা। অসাধারণ বলা ভুল হবে বাংলা সিনেমার অনন্য একটা সিনেমা বেহুলা। এই প্রথম দেখা। দেখেই মুগ্ধ হয়ে গেছি। রুপক সিনেমার উস্তাদ কারিগর জহির রায়হানের অসাধারণ রুপক সিনেমা এটি। স্বৈরাচারী ইয়াহিয়া খানের সামরিক আমলে নির্মিত সিনেমা এটি। স্বেচ্ছাচারী নিষ্ঠুর মনসা সামরিক একটা নায়কের প্রতিক। যে তার শাসন না মানলে তাকে পুজো না দিলে তার কথা না শুনলে সাপের কামড়ে নির্বংশ করে দেয়। আবার বেহুলা নাচ শেখার কারণে পতি হারানোর অভিশাপ পায়। এটা বাংগালী সংস্কৃতির প্রতীক। পাকিস্তানি আমলে বাংগালি সংস্কৃতি চর্চার অলিখিত নিষেধ ছিল। রবীন্দ্র সংগীত করা হয়েছিল নিষিদ্ধ। সব মিলিয়ে দারণ একটা সিনেমা। এত সুন্দর সিনেমাটা সম্পর্কে আগে কিছুই জানতাম না।

Behula Fill Bangla Movie

এটা নায়ক রাজ্জাকের নায়ক চরিত্রে প্রথম ছবি। আর বেহুলা চরিত্রে সুচন্দা। জহির রায়হানের হাত ধরেেই রাজ্জাক প্রথম কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে। যদিও ছবিতে বেহুলার তুলনায় লখিন্দর অনেকটা কম ফোকাসে থাকে।

বেহুলা। জহির রায়হানের অবাক করার মতো সিনেমা।

বেহুলার সখিদের জলকেলি গান, বাসর ঘরে সুচন্দার অভিনয়, ভেলায় ভেসে থাকা, ইন্দ্রপুরীতে স্বামীর কংকাল নিয়ে হাজির হওয়া আর ইন্দ্রপুরীর ময়ুর নাচের মুগ্ধ দৃশ্য চোখে আটকে থাকে।

আর স্বৈরাচারী মনসা যার চরিত্র গল্প দেখেই তীব্রভাবে বুঝা যায় । পাকিস্তান দেশে বাংলা প্রদেশে জহির রায়হান কেন বানালেন এই সিনেমা

লেখক: Tauhid Moktadir, চলচ্চিত্র সমালোচক