63 / 100

‘ফাইন্ড মি গিল্টি’ ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া একটি কোর্টরুম কমেডি-ড্রামা। এটা সিডনী লুমেটের বানানো দ্বিতীয় সর্বশেষ সিনেমা। কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্যাংস্টার জ্যাকি ডিনর্সিও-র রোলে অভিনয় করেছেন ভিন ডিজেল। সাথে গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ব-চরিত্রে ছিলেন গেম অব থ্রোনসের জন্য খ্যাত পিটার ডিংকলেজ।

দুটো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে শুরু করি!

[১] এই সিনেমার কেন্দ্রীয়ে চরিত্রে আছেন ‘ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস’ মুভি সিরিজ খ্যাত ভিন ডিজেল তবে এটা কোনো এ্যাকশন ফিল্ম নাহ। এটা একটা কোর্টরুম ড্রামা।

[২] এই সিনেমার পরিচালক হচ্ছেন ১৯৫৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বিখ্যাত সিনেমা ’12 Angry Men’ বানানো ভদ্রলোক সিডনী লুমেট

find me guilty cinema
ফাইন্ড মি গিল্টি

বাকি অনেকের মত আমারো একটা চিরায়িত ধ্যানধারণা ছিলো ভিন ডিজেল শুধুমাত্র এ্যাকশন ছবিতেই কাজ করেন। কিন্তু কিছুদিন আগে ইন্টারনেট ঘাটতে ঘাটতে ‘ফাইন্ড মি গিল্টি’ সিনেমাটা খুঁজে পায়। বারবার ক্রসচ্যাক করতে হয়েছে এটা নিশ্চিত করতে যে আসলেই সিডনী লুমেটের সিনেমায় এটা ভিন ডিজেল কিনা! এই সিনেমার শুরুর দৃশ্যই এতো বেশি অবাক করা যে প্রত্যেক দর্শকই একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাবে। ‘ফাইন্ড মি গিল্টি’ ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া একটি কোর্টরুম কমেডি-ড্রামা। এটা সিডনী লুমেটের বানানো দ্বিতীয় সর্বশেষ সিনেমা। কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্যাংস্টার জ্যাকি ডিনর্সিও-র রোলে অভিনয় করেছেন ভিন ডিজেল। সাথে গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ব-চরিত্রে ছিলেন গেম অব থ্রোনসের জন্য খ্যাত পিটার ডিংকলেজ। গল্প আবর্তিত হয় আমেরিকার দীর্ঘতম ক্রিমিনাল ট্রায়াল নিয়ে। এক ইতালিয়ান গ্যাংস্টার পরিবারের ২২ জন সদস্য হচ্ছেন অভিযুক্ত আসামীরা, মোট ৭৬টি মামলা। মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লেগেছে টানা ২২ মাস। গ্যাংস্টার জ্যাকি ডিনর্সিও-র ৩০ বছরের জেল হয়েছে এমনকি তার সাজাও শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে তার সাথে ড্রাগ বিজনেসের সঙ্গী তার পরিবারের আরো ২১ জন সদস্যদেরও বিরুদ্ধে ড্রাগ বিজনেসের সাথে এবং অন্যান্য গুরুতর অভিযোগের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ২২ জন মানুষকে একসাথে একই ট্রায়ালে দেয়া হয়েছে। সমস্যাটা হচ্ছে যখন ২২ জন মানুষ যখন একই দোষে দোষী তখন তাদের মধ্যে ‘চাচা আপন পরান বাঁচা’ ভাবের আবির্ভাব হবে অর্থাৎ কেউ যদি নিজেকে বাঁচানোর জন্য অন্যকে ডুবিয়ে দিতে চাই তাহলে খুব সহজে সেটা করতে পারে। এই গ্যাংস্টার পরিবারের মধ্যেও একই বিষয় নিয়ে বারবার ভয় হয়। তারা নিজেদের নিয়ে যতটা ভীত তার চেয়ে বেশি ভীত জ্যাকি ডিনর্সিওকে নিয়ে যার কৌতুক করা, ছটপটে, বাচাল স্বভাব তাদের মাটিতে বসাতে পারে। এদিকে মরার উপর খড়ার খা হচ্ছে ২২ জনের মধ্যে জ্যাকি ছাড়া সবাই নিজেদের জন্য উকিল নিযুক্ত করেছে কিন্তু জ্যাকি নিজের জন্য উকিল ঠিক করবেনা। সে নিজেকে নিজে ডিফেন্ড করবে। এতো বড় একটা মামলা যেখানে এত সাক্ষী এত প্রমাণ, সেখানে জ্যাকির উকিল ছাড়া

নিজেকে নিজে ডিফেন্ড করাটা বাকি সবার জন্য তরী ডোবানো হতে পারে। কিন্তু জ্যাকি সেরকম নয়। সে মনে করে সবাই তাকে ভালোবাসে। এদিকে সরকার পক্ষের উকিলসহ সরকার দলীয় লোকজন জ্যাকিকে নানারকম প্রলোভন দেখানো শুরু করে। কিন্তু তাদের লোভনীয় কোনো অফারে জ্যাকি ঢলে পড়ার মতো নয়। সে কোনো অবস্থাতেই তার পরিবারের কারো বিরুদ্ধে গিয়ে সাক্ষ্য তো করবেই না বরং কোর্টরুমে নিজের হিউমার, বাকপটুতা দিয়ে নিজেকে ডিফেন্ড করে সে গোটা জুরি থেকে জাজ, এমনকি পরিবারের সদস্যদেরও মন জিতে নেয়া শুরু করে। এভাবে কোর্টরুমে জ্যাকি তার নিজস্বতা, উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে ধীরে মামলা নিজেদের পক্ষে নেয়া শুরু করে এবং শেষ পর্যায়ে এসে সরকার দলের করা লোভনীয় অফারে না করে দেয় এবং পরিবারের বাকিদেরও কোনো প্রলোভনে সাড়া না দিতে উৎসাহিত করে।

সিডনী লুমেটের কোর্টরুম কমেডি ড্রামা ‘ফাইন্ড মি গিল্টি’ মারাত্মক হাস্যরসে ভরা। জ্যাকি ডিনর্সিও চরিত্রের মধ্যে একজন শতভাগ বিশ্বস্ত, মানবিকবোধ সম্পন্ন, হিউমরে ভরা, বাকপটু গ্যাংস্টারের চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এজন্য ভিন ডিজেলকে কাস্ট করাটা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়লেও লুমেট ভিন ডিজেলকে এ্যাকশন সিনেমায় হিরো হিসেবে মূল্যায়ন না করে এমন ড্রামাতে অভিনয় করার জন্য তার ভেতর থেকে যে অভিনয়ের দক্ষতাটা বের করে এনেছেন সেটা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। জ্যাকি ডিনর্সিও চরিত্রে ভিন ডিজেল এক কথায় অনবদ্য। এছাড়া, পার্শ্বীয় চরিত্রে পিটার ডিংকলেজ খুব শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছেন। কোর্টরুমে জ্যাকি ডিনর্সিওর জবানবন্দি, ক্রস-এক্সামিনগুলো দেখতে কিছুটা শিশুসুলভ মনে হয়লেও এটাই মূলত সিনেমাকে আরো বেশি বাস্তবিক করে তোলে যেহেতু সিনেমার শুরুতে বলা হয়েছে যে সিনেমাতে দেখানো সংলাপের বেশিরভাগ অংশই সত্যিকারের জবানবন্দি। একজন গ্যাংস্টার ভালো না খারাপ সেই যুক্তিতে না গিয়ে একজন গ্যাংস্টারের বিশ্বস্ততা, মানবিকতা এসব বিষয়কেই ফুটিয়ে তোলাতেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন পরিচালক। একইসাথে দেখানো হয়েছে, যেকোনোভাবে মামলা জিতে উঠার জন্য সরকারের দলের করা বিভিন্ন অন্যায় কাজ যা কিনা তাদের কার্যক্রমের পদ্ধতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। একজন মানুষের আত্মত্যাগ কিভাবে অনেকগুলো মানুষকে জেলের ভাত খাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেয় সেটাই আষ্ঠেপৃষ্ঠে ফুটে উঠে।