66 / 100

নির্বাক সিনেমা সৃজিত ২০১৫ সালে বানাইছে এ থেকেই বোঝা যায় সৃজিত কতবড় ট্যালেন্টেড ডাইরেক্টর। ‘১৫ তে যখন সিনেমা টা রিলিজ হয় ট্রেইলার দেখে কেউ সিনেমা দেখতে যায় না। অনেকে গিয়ে ও কিচ্ছু বোঝে নি। অনেক মহাপন্ডিত ও এই সিনামা টাকে ট্র্যাশ এর খাতায় ফেলে দিয়েছিলো। আমি বলছি না যে আমি এই সিনেমা পুরা বুঝে ফেলছি।

আমি সিনেমা টা টানা বিরতিহীন ৩ বার দেখার পর মূল থিম টা বুঝতে পেরেছি। এবং বোঝার পরে মনে হয়ে ‘This is one of most brilliant film from Tollywood’. এই সিনেমা টা এক কথায় একটা মাস্টারপিস। এক ই সাথে ‘This film is not for Everyone.’ কারণ অনেকেই সিনেমা টা পছন্দ করবে না বা মাথায় ঢুকবে না। অনেক সিনেমা দেখছি আজ পর্যন্ত, কিন্তু এতো দারুন বাংলা সিনেমা খুব কম দেখছি। সিনেমাটা দেখার পর I was like ‘এই সিনেমার রিভিউ না লিখলে পাপ হবে’। তবে যারা আগে সৃজিত এর চতুষ্কোণ আর হেমলক সোসাইটি পছন্দ করেছেন তাদের নিঃসন্দেহ ভালো লাগবে। এখন আসি সিনেমায়।

সিনেমা রিভিউ

সিনেমায় যারা অভিনয় করেছেন তারা এক কথায় ফাটায় দিয়েছে। বিশেষত অঞ্জন দত্ত এবং ঋত্বিক। সিনেমায় মোট ৪ টা কাহিনী রয়েছে। ৪ টাই ভালোবাসার গল্প। এবং যে যার গল্পে নির্বাক। অর্থাৎ যার কাহিনী সে নীরব।

প্রথম দৃশ্যে অঞ্জন দত্ত কে দেখা যায়। যেখানে সে খুব ই একা মানুষ। সে নিজেকে খুব ভালোবাসে। সে আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে চুমু ও দেয়। সে ঘন্টাখানেক ধরে প্রতিদিন স্নান করেন। সে নিজের চেহারা, ড্রেসয়াপ নিয়ে খুব ই স্পর্শকাতর। সে নিজের জন্মদিনে নিজের জন্য জন্মদিনের গান গায়। নিজেই নিজের গালে কেক মাখেন। এভাবেই তার দিন কাটে। হঠাৎ খুব বাজে ভাবে বাথরুমে পরে গিয়ে সে খুব আঘাত পায় এবং তার স্মৃতি হারিয়ে যায়। এর ই মধ্যে সুস্মিতা সেন এর কাহিনী টি শুরু হয়।

সুস্মিতা সেন এর বয়ফ্রেন্ড যীশু। কিন্তু সুস্মিতা’র সঙ্গে তার মন কষাকষি হয়। সে তাই একটা পার্কে একটা বেঞ্চে বসে থাকে। তার মাথার উপর বিশাল এক গাছ। এই গাছ টা সুস্মিতা’র প্রেমে পড়েছে। এবং সে চায় না সুস্মিতা তাকে ছেড়ে যাক। সুস্মিতা গাছের নিচে এসে বসলেই গাছ টা থেকে সুন্দর বাতাস বয়। সেই বাতাসে ঘুমিয়ে পড়ে বেঞ্চিতে। এক সময় গাছটি তার প্রাণরস, একধরণের কষ ত্যাগ করে। যা সুস্মিতা’র গায়ে পড়ে। সুস্মিতা’র প্রতি গাছ টা এতোটাই দূর্বল যে যীশু সুস্মিতা’র সঙ্গে ঝামেলা মিটাতে আসলে গাছে বসবাসরত পাখি গুলি যীশু’র গায়ে মল ত্যাগ করে। বারবার। এতে যীশু কোন কথা বলতে পারে না। এবং যীশু সুস্মিতা কে কোলকাতা থেকে নিয়েও যেতে পারে না।

এরপরের কাহিনী তে যীশু। যীশু সুস্মিতা কে নিয়ে নতুন একটা বাসা নেয়। যেখানে ওর খুব একান্ত বলতে শুধু একজন। সে আবার নির্বাক। একটা কুকুড়। ফিমেইল কুকুড়। কুকুড় টা তার মালিক অর্থাৎ যীশু কে খুব ভালোবাসে। সে যীশুর প্রতি প্রচন্ড দূর্বল। এবং সে পছন্দ করে না যীশু’র কাছে কেউ আসুক। তো তার সুস্মিতাকে সহ্য হয় না। সে বাজেভাবে রিয়্যাক্ট করে সুস্মিতা’র প্রতি। এবং একদিন যীশু অফিস যাওয়ার পর সুস্মিতা যখন কুকুড় টাকে খাবার দিতে যায় কুকুড় টা সুস্মিতা কে এটাক করে। যীশু ফিরে এসব দেখে তো রাগে হাই। যীশু বেল্ট দিয়ে কুকুড় টিকে প্রচুর মারে। এতে কুকুড় টিও অনেক কষ্ট পায় যীশু ও কষ্ট পায়। পরে তারা ঠিক করে যে কুকুড়টিকে তারা রাখবে না। কুকুড় টিকে ছাড়তে যাওয়া সময় সে বুঝতে পারে তাকে তার মালিক রাখবে না। তাই সে গাড়ি চলন্ত অবস্থায় ডোর খুলে দিয়ে লাফ দেয়। এবং গাড়ি এএক্সিডেন্ট করে। এক্সিডেন্টে সুস্মিতা মারা যায়।

এই দিন সকালে যীশু’র গাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল ঋত্বিক। যে কিনা একটা মর্গে লাশ দেখা শোনার কাজ করেন। পরে সুস্মিতা’র লাশ টাও তার মর্গে আসে। সে সুস্মিতা কে দেখে তার প্রেমে পড়ে যায়। সেখানে বসে সে উইড খায়, সুস্মিতা কে লাল গোলাপ দেয়, তার চুল আচড়ে দেয়, বডি স্প্রে দিয়ে দেয়। ঠান্ডা লাগলে টেম্পারেচার কমিয়ে দেবে এমন বলে। সে জানে কয়েকদিন পর এই লাশ টা মাটির নিচে যাবে কিন্তু তারপর ও ঋত্বিক সুস্মিতা কে অনেক ভালোবাসে। এতোটাই ভালোবাসে যে নিজের জীবন টা পর্যন্ত দিয়ে দেয়। লাশ চোরেরা লাশ নিতে এলে সে লাশ দেয় না। এবং চাবি ফেলে দেয়। এতে গুন্ডা রা তাকে মেরে ফেলে। এভাবেই তার প্রেম কাহিনী’র ইতি ঘটে।

সিনামা টা এতো কম ডায়লগে তৈরি যে আপনি সাউন্ড অফ করেও বুঝবেন কি হচ্ছে। এবং প্রত্যেক টা ভালোবাসার গল্পেই কিন্তু মূখ্য চরিত্র নির্বাক। একটা গাছ। গাছ এর ভালোবাসা, কুকুড়ের ভালোবাসা। একটা লাশ কে ভালোবাসা। নিজেকে ভালোবাসা। সম্পূর্ণ অদ্ভুত একটি সিনেমা। ২০১৫ তে এইটা রিলিজ পেয়েছিলো। কিন্তু এই সিনেমা টা ওই সময়ের থেকে কত বেশি আগানো তা আমি শিওর না। এতো দারুন সিনেমা ২০২৫ এও আসবে না।

এই সিনামার ক্যামেরার কাজ। এইটা নিয়ে আমার বলতেই হবে। এতো মনোমুগ্ধকর ক্যামেরার কাজ না দেখলে চিন্তা করতে পারবেন না। ক্যামেরা কাজ, ভিজুয়াল স্টোরেটেলিং, গান এগুলা একদম হলিউড ঘরানার ছিলো। এই সিনেমা টা বুঝলে সৃজিত দা’কে আপনি ভালোবাসতে বাধ্য। আর কিছু বলতে চাই না। যদি কেউ দেখতে চান ঠান্ডা মেজাজে সময় নিয়ে দেখে ফেলেন। You’ll love it!! 🖤