73 / 100

ধর্মে নয়, ‘পিকে সিনেমা‘ আঘাত করেছে ভণ্ড ধর্মগুরুদের! কট্টরপন্থী মৌলবাদীদের। ঈশ্বর একটাই ধর্ম তৈরি করেছেন সেটা হলো ‘মানুষ ধর্ম’! কে হিন্দু? কে মুসলমান? তার চিহ্ন কোথায় দেখাও? ‘পিকে’ হচ্ছে কাজী নজরুলের মত ‘সাম্যবাদী’ একটা ক্যারেক্টার। নজরুলের মতই জাতি,ধর্ম,বর্ণ,ধনী-গরীব,উচু-নিচুঁ সকল বিভেদ ভুলে মানবতাবাদই পরম ধর্ম।

বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার জন্য ব্যাপক সমালোচিতও হয়েছে রাজকুমার হিরানিআমির খান জুটির সর্বশেষ ছবি পিকে। তবে আমার মতে, কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো কোনো উপাদান এই ছবিতে নেই। ছবিটি কারো আঁতে যদি ঘা দিয়েই থাকে, সেটা এই ছবির তপস্বী মহারাজ চরিত্রটির মতো ভণ্ড ধর্মগুরুদেরই দিয়েছে। যারা ধর্মব্যবসা করে খান,পিকে সিনেমায় তাদেরই আঁতে আঘাত লেগেছে।

পিকে সিনেমায় আসলে ঈশ্বর সম্পর্কে কী বলা হয়েছে, অধিকাংশ মানুষের সে ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা নেই। ‘পিকে’ চরিত্রটি নাস্তিক নয়। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই, এই বক্তব্য প্রমাণ করার জন্য পিকে নয়। পিকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার তো করেই না, বরং আসল ঈশ্বরের বা এক সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে তুলে ধরে। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে পিকে সত্য ঈশ্বরের স্বরূপ উদ্‌ঘাটনের এক প্রয়াস মাত্র এবং একই সঙ্গে ধর্মব্যবসায়ীদের ভণ্ডামি ও মিথ্যে শিক্ষা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

অনেকেই এই বলে লাফাচ্ছেন যে পিকে হিন্দুধর্মকে ধুয়ে দিয়েছে। আসলে তারা সিনেমার মূল বক্তব্য ধরতে পারেননি। বাস্তবে পিকে হিন্দু কেন, কোনো ধর্মকেই ধুয়ে দেয়নি। ধুয়ে দিয়েছে সব ধর্মের মধ্যে, ধর্মের নামে করা ভণ্ডামি ও মূর্খতাকে, কুসংস্কারকে।

কী আছে পিকে সিনেমার কাহিনিতে?

রাজকুমার হিরানি-আমির খান জুটির সর্বশেষ ছবি পিকে।

সিনেমার শুরুতেই আমরা দেখতে পাই অন্য গ্রহ থেকে আসা আমাদের মতো এক মানুষ পিকের (আমির খান) স্পেসশিপ অবতরণ করে ভারতের রাজস্থানের এক মরুভূমিতে। পৃথিবীতে অবতরণের পর পিকের স্পেসশিপ ফিরে যায় তার গ্রহে। এর পরপরই চুরি যায় পিকের স্পেসশিপের রিমোট। পৃথিবীর নোংরা বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। কথা বলতে পারা সময়টার মধ্যে পিকের অভিজ্ঞতাগুলোর মাধ্যমে এই পৃথিবীর আদবকায়দা, চালচলন সম্পর্কে ধারণা পায়। কথা বলতে শেখার পরই রিমোট খুঁজতে বের হয় পিকে। নিজের অধিকার আদায়ের জন্য সেই তার সংগ্রামের শুরু।

সংক্ষেপে এই হলো পিকের গল্প।

এবার ফিরে আসা যাক এই সিনেমার ঈশ্বর ও ধর্মসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে। পৃথিবীতে বর্তমানে প্রচলিত ধর্মগুলোকে নিয়ে পিকে সিনেমায় একটু মজা যে করা হয়নি, তা নয়। ছবিটিতে একেকটি ধর্মকে একেকটি কোম্পানি বলা হয়েছে। আর ধর্মগুরুদের বলা হয়েছে ওই কোম্পানির ম্যানেজার। সম্ভবত এটা করা হয়েছে ধর্মে ধর্মে ভিন্নতা, বৈপরীত্য এবং ধর্মগুরুদের ভণ্ডামি বোঝাতে। ধর্মের নাম করে কিছু মানুষ ব্যবসা করে খান। পিকেসিনেমাটি সেই বক্তব্য উপস্থাপন করে।

ভ্রান্ত ধর্মীয় রীতিনীতিকে এই ছবির মাধ্যমে তীব্র কটাক্ষ করা হয়েছে। পিকের প্রশ্নগুলো দ্বারা একই ধর্মের একাধিক পরস্পরবিরোধী শিক্ষার অসারতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে। যেমন, মূর্তি নিয়ে একটি কঠিন সত্য পিকে তুলে ধরে যখন সে বলে সত্যিকারের ঈশ্বর কখনোই চাইবেন না তার মূর্তিতে হাজার হাজার লিটার দুধ ঢালা হোক। বরং তিনি চাইবেন যেন ওই দুধ কোটি কোটি অনাহারি পথশিশুকে দেওয়া হয়। মূর্তির গায়ে দুধ ঢালার এই প্রথার প্রতি কটাক্ষ রাজকুমার হিরানির পিকেরই প্রথম নয়। এর আগে ২০১২ সালের উমেশ শুক্লার ও মাই গড (ওএমজি) ছবিতেও একই প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয়েছিল। সেখানেও বলা হয়েছিল মূর্তির গায়ে দুধ ঢালার চেয়ে গরিব শিশুদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার কথা। প্রকৃতপক্ষে ওএমজি ওপিকে সিনেমা দুটোর উপজীব্য একই। দুটো সিনেমাই অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় কুসংস্কার এবং ভণ্ড গুরুদের ধর্মব্যবসা মানুষের সামনে তুলে ধরে।

ধর্মব্যবসায়ীদের পুঁজি হলো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের ভয়। পিকের একটি জনপ্রিয় সংলাপ হলো ‘যো ডর গিয়া, ও মন্দির মে গ্যায়া’ (যে ভীত সে মন্দিরে যায়)। এমনকি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাভীতিকে পুঁজি করে কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে টাকা কামানো যায়, একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে পিকে তা প্রমাণ করে দেয়। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের ভীতিকে কাজে লাগিয়ে শুধু টাকা কামানোই নয়, আরো অনেক বড় ধ্বংসাত্মক কাজ করে থাকে ভণ্ড ধর্মগুরুরা।

ধর্মে ধর্মে পোশাকের ভিন্নতা এবং এর ফলে সৃষ্ট জটিলতা ও বিভ্রান্তি নিয়ে পিকেতে মজা করা হয়েছে। হিন্দুধর্মে বিধবার জন্য বরাদ্দ সাদা পোশাক, যা খ্রিষ্টান নারীরা বিয়ের দিন পরেন। অন্যদিকে খ্রিষ্টানদের জন্য মৃতদের শোক প্রকাশের পোশাকের রং কালো, যা মুসলিম নারীরা সচারাচার বোরকা হিসেবে পরে থাকেন।

একজন মানুষের পোশাক বা বাহ্যিক অবয়ব দেখে তার ধর্মের বিচার করা যে কতটা বোকামি, সেটা পিকে খুব সুন্দরভাবে তপস্বীকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু পোশাক অদল-বদল করে দেওয়ায় তপস্বী মানুষের ধর্ম সম্পর্কে ভুল ধারণা করেছিলেন। গোঁফ-দাঁড়ি ও পাগড়িওয়ালা লোক মানে শিখ। পাগড়ি বাদ তো তিনি হিন্দু। গোঁফ নেই তো তিনি মুসলমান। পোশাক আর বাইয়ের অবয়ব দেখে আমরা একজন লোকের ধর্মীয় পরিচয়ের বিচার করে ফেলি। এখানে পিকের যুক্তি খুবই সরল। প্রকৃত ঈশ্বর মানুষের ধর্ম অনুযায়ী আলাদা আলাদা পোশাক পরার বিধান দেননি। মানুষই এই বিভেদ সৃষ্টি করেছে। যদি ঈশ্বর ধর্মীয় বিভেদের চিন্তা করতেন, তবে একটি শিশুর শরীরে নির্দিষ্ট একটি ধর্মের ছাপ লাগিয়ে দিতেন।

পিকের ঈশ্বরতত্ত্ব বুঝতে হলে পিকের সঙ্গে তপস্বী মহারাজের লাইভ টেলিভিশন বিতর্ক দৃশ্যটি মনোযোগ গিয়ে দেখতে হবে। তপস্বীর প্রশ্নের জবাবে পিকে স্বীকার করে নেয় যে দুর্দিনে ঈশ্বরই ছিলেন তার সহায়। ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখলে মানুষ আশা পায়, ভরসা পায়। প্রতিকূল সময় মোকাবিলায় সাহস ও শক্তি পায়। তবে একই সঙ্গে পিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, কোন ঈশ্বরে বিশ্বাস করব? যে ঈশ্বর আমাদের সবাইকে বানিয়েছেন, না যে ঈশ্বরকে তপস্বীর মতো ভণ্ড গুরুরা বানিয়েছে?

পিকে সিনেমা

পিকে বলে, যে ঈশ্বর আমাদের বানিয়েছেন, তার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। কিন্তু যে ঈশ্বরকে তোমরা বানিয়েছ, সে ঈশ্বর ঠিক তোমাদেরই মতো। তোমাদের তৈরি ঈশ্বর মিথ্যাবাদী, ছল, ভুয়া প্রতিশ্রুতি দেয়। ধনীদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখায়, গরিবদের অবহেলা করে। তোষামোদে খুশি হয়। মানুষকে ভয় দেখায়।

সঠিক পথ কী, সেটা সম্পর্কে পিকের বক্তব্য হলো, যে ঈশ্বর আমাদের সবাইকে বানিয়েছেন, তার ওপর বিশ্বাস রাখো। আর তপস্বীর মতো ভণ্ড ধর্মগুরুরা যে ঈশ্বরকে বানিয়েছে, তাকে ছুড়ে ফেলো। এই পর্যায়ে তপস্বী বলেন, তুমি আমাদের ঈশ্বরের ওপর হাত তুলবে, আর আমরা চুপ করে বসে থাকব? না, বরং আমরা আমাদের ঈশ্বরকে রক্ষা করব।

তপস্বীর এই কথায় পিকে খানিকটা রেগে যায়। সে বলে, তুমি করবে ঈশ্বরকে রক্ষা? পৃথিবী ছোট্ট একটি গ্রহ। মহাবিশ্বে পৃথিবীর চেয়ে বড় লক্ষ কোটি গ্রহ ঘূর্ণয়মান। আর তুমি এই ছোট্ট গ্রহের এক ছোট্ট শহরের ক্ষুদ্র গলিতে বসে বলো তুমি তাকে রক্ষা করবে, যিনি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। তাকে রক্ষার জন্য তোমাকে প্রয়োজন নেই। তার রক্ষা তিনি নিজেই করতে পারেন। তার পরও মানুষ যদি যার যার ঈশ্বরকে রক্ষা করতে চায়, তবে যে হানাহানি, বোমাবাজি অনিবার্য, যাতে মানবজাতির অস্তিত্ব পড়বে হুমকির মুখে। এ ক্ষেত্রে পিকে ট্রেনে বিস্ফোরিত বোমায় নিহত বন্ধু ভেরো সিংয়ের (সঞ্জয় দত্ত) প্রসঙ্গ টেনে আনে।

এই কথার উত্তরে তপস্বী বলে, এক মুসলমানের ফেলা বোমার দায় তার মতো হিন্দু গুরু কেন নিতে যাবে। পিকে তাকে বলে- কে হিন্দু, কে মুসলমান তার চিহ্ন কোথায় দেখাও। এই ভিন্নতা ঈশ্বর না, তোমরা বানিয়েছ, যা এই গ্রহের সবচেয়ে ভয়ানক ভুল। ধর্মের এই বিভক্তির ফলে মানুষ মরে, একে অন্যের কাছ থেকে আলাদা হয়। যেমনটা হয়েছিল ছবির নায়িকা হিন্দু জগগু ও মুসলমান সরফরাজের (সুশান্ত সিং রাজপুত) প্রেমের ক্ষেত্রে।

ধর্ম নিয়ে পিকের বক্তব্য খুবই সোজা। আসল ঈশ্বর ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম তৈরি করেননি, বরং মানুষ করেছে। আলাদা আলাদা ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আলাদা আলাদা ঈশ্বরও তৈরি করেছে। কিন্তু আসল ঈশ্বর একটি ধর্মই সৃষ্টি করেছেন। সেটা হলো মানবধর্ম। মানুষই ঈশ্বরের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় রীতি-নীতি, আচার-আচরণ, পূজা-প্রার্থনা কিংবা ঈশ্বরের জন্য অযথা ত্যাগ-স্বীকার নয়, মানুষের জন্য, মানুষের কল্যাণে কিছু করাটাই ঈশ্বরের কাছে প্রধান বিষয়। অথচ আমরা সেটা ভুলে মানুষের মাঝে তুলে দিই ধর্মীয় বিভেদের দেয়াল। ধর্মের নামে করি মানুষ হত্যা। মানুষের কল্যাণই সৃষ্টিকর্তার লক্ষ্য ও ইচ্ছা। এতে নেই কোনো ছোট-বড়, ধনী-গরিব, মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মের ভেদ।

স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে কষ্ট দেয়ার কোনো মানে নেই। সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার জন্য নিজের পিঠ রক্তাক্ত করার চেয়ে একজন মানুষকে বাঁচানোর জন্য দুটো কিল-ঘুষি হজম করা বহুগুণে শ্রেয়। একদল মূর্খ লোক না জেনে আত্মপীড়ন করে ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করতে চায়, আর একদল অতি চালাক ও দুষ্ট লোক নিজেদের ফায়দা ওঠানোর জন্য এই ধরনের রীতিকে উসকে দেয়।

সুতরাং সত্যিই যদি আপনি সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য পেতে চান, তবে এখনই মানুষের কল্যাণে ব্রতী হন। মানুষকে ভালোবাসুন। মানুষের মতবাদ বা কোনো কথায় উত্তেজিত হয়ে তার ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন। ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করুন। সেটা যদি ইতিবাচক হয় তবে গ্রহণ করুন। যদি সেটা আপনার কাছে ভালো মনে না হয়, তবে পরিহার করুন।

কিন্তু কারো বিশ্বাস, মন্তব্য বা আচার-আচরণের জন্য তার ওপর চড়াও হওয়া, যদি না সেটা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়, কোনো ঈশ্বরই সমর্থন করেন না। কোনো ঈশ্বরই চান না কোনো মানুষের ক্ষতি হয়। আর পিকে সিনেমায় ঠিক এই বক্তব্যই তুলে ধরে হয়েছে। পিকে সিনেমায় ভণ্ড গুরুদের তৈরি নকল ঈশ্বর নয়, আসল ঈশ্বরের সৃষ্টি মানুষকে সবার ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন: ওম শান্তি ওম: জেনে নিন কী কারণে আজও জনপ্রিয়