81 / 100

আপনি কি ভোজন রসিক? বা রান্না করতে ভালোবাসেন এবং একই সাথে ভালো মুভি দেখতে ভালোবাসেন, তাহলে রান্নাবান্নার উপর নির্মিত এই মুভি “আহা রে” আপনাকে দুঘন্টার মানসিক পরিতৃপ্তি দেবে নিঃসন্দেহে! 

আমাদের বাঙ্গালী মা রা যেমন খুব সাধারণ কোন তরকারীতেও তেল নুন মশলা এবং নিজেদের হাতের আদর মিশিয়ে অসাধারণভাবে পরিবেশন করেন, খেয়ে অসম্ভব তৃপ্তি পাওয়া যায়। তেমনি খুবই রিফ্রেশিং, ইউনিক একটা থিম “রান্না”র উপর কলাকুশলীদের অভিনয়, স্ক্রিপ্ট, স্ক্রীনপ্লে, মিউজিক, ইমোশন, লোকেশন, হিস্ট্রিক্যাল নলেজ সব মিলিয়ে বাঙ্গালী আবহে একটা অতি সুখাদ্যই যেন পরিবেশন করলেন পরিচালক রঞ্জন ঘোষ তাঁর “ফুড” মুভি “আহা রে” তে। 

মুভিটা গতবছর টলিউডের ওয়ান অফ দা বিগেস্ট ক্রিটিক্যাল এন্ড কমার্শিয়াল হিট ছিল। দেশ বিদেশের অনেক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরষ্কার পেয়েছিল। আমাদের দেশে রিলিজ না হওয়ার জন্য দেখতে পারছিলাম না। আজ স্ট্রিমিং লিংক ও ইউটিউবে ছেড়ে দিয়েছে জন্য দেখতে পেলাম। 

রে ছবির দৃশ্যে আরিফিন শুভ এবং অমৃতা
আহা রে ছবির দৃশ্যে আরিফিন শুভ এবং অমৃতা

কাহিনী সংক্ষেপঃ ঢাকার একজন নামকরা হোটেলের ইন্টারন্যাশনাল ক্যুজিন শেফ ফারাজ চৌধুরী (আরেফিন শুভ) কলকাতার এক হোটেলের এক্সিকিউটিভ শেফের অফার পেয়ে কলকাতা চলে যান। ইন্টারন্যাশনাল ওরিয়েন্টাল সবরকম ডিশ পারলেও বাঙ্গালী রান্নায় ফারাজের হাত তত পরিপক্ক নয়। এমন অবস্থায় দেখা হয় কলকাতার এক একেবারেই ঘরোয়া কেটারিং সার্ভিসের মালকিন বসুন্ধরা’র সাথে (ঋতুপর্ণা). বসুন্ধরার ১৬ আনা বাঙ্গালী ঘরোয়া রন্ধনশিল্পের দক্ষতা ও ফারাজের কন্টিনেন্টাল ক্যুজিনের গলিঘুঁজি, তাঁদের রান্নার জ্ঞান, দর্শন মিলেমিশে এক হয়. পাশাপাশি রান্না হতে থাকে তাঁদের প্রেমের ডিশও। এর সাথে দুজনের জীবনের নানান আলো অন্ধকার, সুখ দুঃখ সবকিছু একসাথে হয়ে যে অষ্টব্যঞ্জন তৈরি হয় তাঁর নামই “আহা রে” 

আরেফিন শুভর অভিনয়দক্ষতা নিয়ে যাঁদের মনে প্রশ্ন বা সন্দেহ রয়েছে, “আহা রে” দেখলে সেটা অনেকটা দূর হয়ে যাবে আমার বিশ্বাস। এই ছেলেটার যেকোনো চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার এই দক্ষতাটা বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম সিনেমার “নায়কদের” মধ্যে আমি আর পাইনা। ঢাকা অ্যাটাকে যে ছিল পেটানো শরীরের দুঁদে পুলিশ, “আহারে” তে ফাইভস্টার হোটেলের এক্সিকিউটিভ শেফ এর ইউনিফর্মে যেন একেবারে শেফ ই হয়ে গিয়েছে! বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পুরো চেঞ্জ! এই মুভির একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে, মুভিতে এপার-ওপার দুই বাংলার রন্ধনশিল্পের নানান ব্যাকগ্রাউন্ড হিস্ট্রি নিয়ে অনেক জ্ঞান দেওয়া আছে, শুভর ন্যরেশনে সেসব শুনে মনে হচ্ছিল এই লোক আসলেই মনে হয় শেফ! ভালো পরিচালকের হাতে পড়লে এই ছেলে যে যেকারো চেয়ে ভালো ডেলিভার করতে পারে সেটার প্রমাণ রাখল!

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, একজন লেজেন্ডারী সু-অভিনেত্রী। বসুন্ধরা চরিত্রে এতো আবেগ আর এতো ডিপনেস মনে হয়না আর কোন অভিনেত্রী আনতে পারতেন… সমরেশ মজুমদারের মডার্ন উপন্যাসের কোন নারী চরিত্রের সার্থক রূপায়ন যেন পর্দায় দেখা গেল! যে চরিত্রে আছে ব্যক্তিত্ব, আছে আবেগ, আছে চাপা দুঃখ, এছাড়াও বর্ষীয়ান অভিনেতা লেজেন্ড পরান বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরের মতই স্বতঃস্ফূর্ত পারফর্মেন্স দিয়েছেন। ছোটভাইয়ের চরিত্রে যে ছেলেটা অভিনয় করেছে তাঁর অভিনয় ও ভালো।

মুভিটার সবচেয়ে ভালো দিক ছিল এর কন্টেন্ট এর জোর আর পেসিং। ২ ঘন্টার মুভি, কিন্তু ৩০ মিনিটেই মনে হল কতকিছু দেখে ফেলেছি, আরও কতো কিছু বাকি আছে! এবং সেকেন্ড হাফে আসলেও অনেক কিছু বাকি ছিল। বাকি ছিল সবচে বড় টুইস্ট টা! ক্লাইম্যাক্সটা একটু প্রেডিক্টেবল, কিন্তু প্রতিটা ফ্রেম এতো আদর দিয়ে বানিয়েছেন পরিচালক, তার সাথে কলাকুশলীদের সুঅভিনয়, মন ঠান্ডা করে দেওয়া ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, কলকাতা ও বাংলাদেশের অথেন্টিক লোকেশনস, বাঙ্গালী খাবার দাবার, রন্ধনশিল্পের ভিন্নতা, নলেজ সব মিলিয়ে খুবই “ফীল গুড” একটা মুভি।

আরও পড়ুন: বেহুলাঃ জহির রায়হানের ব্লকব্লাস্টার বাংলা সিনেমা।

লেখক: তাওসিফ তান, চলচ্চিত্র সমালোচক