88 / 100

আশির দশকে সারাবিশ্বে ইরান যখন পরিচিত মানবতাবিরোধী, নিষিদ্ধ, নিষ্ঠুর দেশ হিসেবে, ঠিক তখনই তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় হতে গ্র্যাজুয়েট এক শিল্পী (আব্বাস কিয়ারোস্তামি) যেন পাল্টে দিলেন তাঁর তুলির ছোঁয়ায় চলচ্চিত্রকে। যদিও এর আগে নিউ ওয়েভে দারুণ সাড়া পড়েছিলো ইরানের চলচ্চিত্রে।

এর আগে ১৯৭০ সালে নিজের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ‘দ্যা ব্রেড অ্যান্ড এলাই’ দিয়েই নিজের জাত চিনিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়ারোস্তামি। অথচ তিনি তখন সদ্য গ্র্যাজুয়েট‌। চারুকলার সদ্য স্নাতক শিল্পীর ভাবনা ছিলো ফটোগ্রাফি করবেন। কিন্তু এক সিদ্ধান্তেই পালাবদলে এলো তাঁর জীবনে চলচ্চিত্র।

একাধারে চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট, ডিরেকশন, সিনেমাটোগ্রাফি, এডিটিং, মিউজিক, সাউন্ড , সেট সহ একটা চলচ্চিত্রের সবকিছুতে আব্বাস কিয়ারোস্তামিই সর্বসেবা।

১৯৬৯ সালে দারিয়ুশ মেহরুজির বিখ্যাত সিনেমা “গব ” এর মাধ্যমে যখন ইরানী নবতরঙ্গের যাত্রা শুরু হয় তখন আব্বাস কিয়ারোস্তামি নিজের চেষ্টায় কানুন (Institute for the Intellectual Development of Children and Young Adults)-এ চলচ্চিত্র বিভাগ গঠন করেন। কানুনে নির্মীত তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ছিলো ১২ মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্য চিত্র ব্রেড এন্ড অ্যালি ।

১৯৭২ সালে নির্মাণ করলেন তিনি “ব্রেকটাইম”। এক পর্যায়ে কানুন ইরানের একটি অগ্রগামী চলচ্চিত্র স্টুডিওতে পরিণত হয়। আব্বাসের পাশাপাশি তারা ইরানের অন্যান্য বিখ্যাত চলচ্চিত্রকারদের সিনেমাও প্রযোজনা করতে শুরু করে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দ্য রানার এবং বাসু, দ্য লিটল স্ট্রেঞ্জার এর মতো মাস্টারপিস চলচ্চিত্র।

কিয়রোস্তামি
আব্বাস কিয়রোস্তামি By IMDb


সত্তরের দশকে ইরানী সিনেমার নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে আব্বস একটি ব্যক্তিতান্ত্রিক তথা ইন্ডিভিজুয়ালিস্ট অবস্থান গ্রহণ করেন, নৈতিক দিক দিয়ে প্রতিটি ব্যক্তির গুরুত্ব তার কাছে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। এ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন,

“সিনেমার জগৎে ব্রেড এন্ড অ্যালি আমার প্রথম অভিজ্ঞতা এবং বলতেই হয় সেটি ছিল খুব কঠিন। আমাকে কাজ করতে হয়েছিল একটি শিশু, একটি কুকুর এবং চিত্রগ্রাহক বাদ দিলে একটি অপেশাদার ক্রু নিয়ে। তারা সবাই সর্বদা এটা ওটা নিয়ে অভিযোগ করে যাচ্ছিল। আর চিত্রগ্রাহক চলচ্চিত্রায়নের যে কৌশলের সাথে পরিচিত ছিল তা আমি ব্যবহার করিনি।”

নির্মাণ করলেন একে একে ;দ্যা এক্সপেরিয়েন্স, দ্যা ট্রাভেলার, সো ক্যান আই এর মতো বিখ্যাত সব স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র।

১৯৮৭ সালেই যেন ঝড়ের মতো আবির্ভাব হলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। মুক্তি তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “হোয়ার ইজ দ্যা ফ্রেন্ডস হোম।’ এই চলচ্চিত্রের কাহিনী অতিরিক্ত রকমের সহজ-সরল কিন্তু অসম্ভব শক্তিশালী।

মূল চরিত্র একটি আট বছর বয়সের স্কুল ছাত্র যাকে তার বন্ধুর নোটখাতা ফিরিয়ে দিতে হবে। স্কুল থেকে ভুলে সে এটা নিয়ে এসেছে এবং আগামী কালের স্কুলের আগে ফেরত দিতে না পারলে তার বন্ধু বাড়ির কাজ করতে পারবে না এবং তাকে স্কুল থেকে বের করেও দেয়া হতে পারে। বন্ধুর বাড়ি পাশের গ্রামে, কিন্তু বাড়িটি সে চেনে না। একেক জনের কাছে জিজ্ঞেস করে সে খাতা নিয়ে বাড়িটি খুঁজতে থাকে। এতে ইরানের গ্রাম্য মানুষের বিশ্বাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সানগ্লাসে আব্বাস কিয়ারোস্তামি
প্রিয় সানগ্লাসে আব্বাস কিয়ারোস্তামি



বারংবার ইরানের গ্রাম্য দৃশ্য তুলে ধরা এবং সহজ-সরল বাস্তবতা এই চলচ্চিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য, এ দুটোকে আব্বাস কিয়ারোস্তামির চলচ্চিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবেই আখ্যায়িত করা যায়। এছাড়া চলচ্চিত্রটি আব্বাস বানিয়েছিলেন হয়েছে পুরোপুরি একজন বালকের দৃষ্টিকোণ থেকে।

এটিই তাঁর কোকের ট্রিলজির প্রথম চলচ্চিত্র। ১৯৯২ সালের লাইফ অ্যান্ড নাথিং এবং ১৯৯৪ সালের থ্রু দি অলিভ ট্রিস হলো এই ট্রিলজির বাকি দুই চলচ্চিত্র। কারণ এই ট্রিলজির সবগুলো চলচ্চিত্র উত্তর ইরানের এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রাম “কোকের” কে কেন্দ্র করে। চলচ্চিত্রগুলোর ভিত্তি ১৯৯০ সালের মনজিল-রুদবার ভূমিকম্প যাতে ৪০ হাজারের বেশী মানুষ মারা গিয়েছিল। কিয়ারোস্তামি জীবন, মরণ, পরিবর্তন এবং সন্ততি এই থিমগুলোর মাধ্যমে তিনটি চলচ্চিত্রকে সংযুক্ত করেছিলেন।

অবশ্য আব্বাস কিয়ারোস্তামি বলতেন এই তিনটি চলচ্চিত্র ট্রিলজি না। বরং হোয়ার ইজ দ্যা ফ্রেন্ডস হোম আলাদা। তবে লাইফ অ্যান্ড নাথিং মোর এবং থ্রু দি অলিভ ট্রিস ও ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া মাস্টারপিস চলচ্চিত্র টেস্ট অব চেরি ট্রিলজির হতে পারে।

মূলোৎপাটিত করে একটি গাছকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেলে সে আর ফল দেবে না। অন্তত আপন স্থানে সে যত ভাল ফল দিত নতুন স্থানে তত ভাল দেবে না। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমি মনে করি দেশ ছেড়ে গেলে আমার অবস্থা হতো সেই গাছের মত। – আব্বস কিয়রোস্তামি

উইকিপিডিয়া

এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, ১৯৮৭ সালে আব্বাস কিয়ারোস্তামি “দ্যা কি” চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন। আবার এডিটিং ও করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরিচালনা করেননি। পরিচালক ছিলেন আরেক মাস্টার ফিল্মমেকার ইব্রাহিম ফরুজেশ। হোয়ার ইজ দ্যা ফ্রেন্ডস হোমের পরের চলচ্চিত্র হলো ১৯৮৯ সালে নির্মিত বিখ্যাত চলচ্চিত্র হোমওয়ার্ক।

কিন্তু সব পাল্টে দিলো ১৯৯০ সালই। ১৯৯০ সালে মুক্তি পেল ক্লোজ আপ চলচ্চিত্র। সত্য ঘটনা অবলম্বনে হওয়া এই চলচ্চিত্রে দেখা যায় একজন ছদ্মবেশী চলচ্চিত্রকার একটি পরিবারের কাছে নিজেকে কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার মোহসেন মাখমালবাফ নামে পরিচয় দিচ্ছেন এবং বলছেন তার পরবর্তী চলচ্চিত্রে এই পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অভিনয় করাবেন। একসময় বুঝতে পেরে পরিবারটি তাকে চুরি-ডাকাতির দায়ে অভিযুক্ত করে। কিন্তু ছদ্মবেশী হোসেন সাবজিয়ান দাবী করেন ছদ্মবেশ ধারণের কারণ অনেক জটিল।

কিয়ারোস্তামি In Gozaresh
আব্বাস কিয়ারোস্তামি In Gozaresh Shooting



আধা প্রামাণ্য আধা কল্পিত এই চলচ্চিত্রেয সাবজিয়ানের মাখমালবফের ছদ্মবেশ ধারণের পেছনে নৈতিক দায়বদ্ধতা যাচাই করে দেখা হয় এবং তার সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক দক্ষতা বা নৈপুণ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। এই চলচ্চিত্রটি সাড়া ফেলে দিলো গোটা বিশ্বে। এর কাহিনীর অভিনবত্ব অবিশ্বাস্য।

জঁ লুক গলার, নান্নি মোরেত্বি, কুয়েন্টিন টারান্টিনো, ভের্নার হেরৎসগ, স্কোরসেজির মতো মাস্টার ফিল্মমেকাররা এই চলচ্চিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

১৯৯২ সালে আব্বাস কিয়ারোস্তামি নির্মান করলেন, কোকের ট্রিলজির দ্বিতীয় চলচ্চিত্র বিখ্যাত চলচ্চিত্র “লাইফ এন্ড নাথিং মোর।” চলচ্চিত্রে দেখা যায়, একজন বাবা তার বালক ছেলেকে নিয়ে তেহরান থেকে কোকের গ্রামে যাচ্ছেন নিজের গাড়ি চালিয়ে। উদ্দেশ্য, দুটি ছেলেকে খুঁজে বের করা যারা ভূমিকম্পে মারা গিয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করতে থাকে বাবা-ছেলে।

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তারা বেঁচে যাওয়া অনেক মানুষের মুখোমুখি হয় যারা এত কষ্টের মাঝেও জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। কোকের ত্রয়ীর শেষ চলচ্চিত্র ছিল থ্রু দ্যা অলিভ ট্রিস । এই চলচ্চিত্র এক চলচ্চিত্রকারকে কেন্দ্র করে রচিত। যিনি চলচ্চিত্রের জন্য কোকের এ এলেন। এই চলচ্চিত্রে দেখা যায় চলচ্চিত্রের দৃশ্য ধারণ, অভিনয় চলছে।

অ্যাড্রিয়ান মার্টিনের মত বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচকরা কোকের ত্রয়ীর নির্মাণ পদ্ধতিকে ডায়াগ্রামাটিক্যাল বা জ্যামিতি ক আকৃতিমূলক বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ” চলচ্চিত্রে দেখানো গ্রামের দৃশ্যগুলোকে আঁকাবাঁকা পথ এবং জীবন ও পৃথিবীর বিভিন্ন শক্তির জ্যামিতি বহিঃপ্রকাশ স্পষ্ট।”

এরপরেই আব্বাস কিয়ারোস্তামি চিত্রনাট্য লিখলেন দুটি বিখ্যাত চলচ্চিত্রের। প্রথমটি বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আলী রেজা রাইসিয়ান এর “দ্য জার্নি” চলচ্চিত্র অপরটি বিশ্বখ্যাত ইরানী চলচ্চিত্রকার জাফর পানাহির প্রথম চলচ্চিত্র “দ্য হোয়াইট বেলুন” এই চলচ্চিত্র কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্র হয়েছিলো ১৯৯৫ সালে।

আরও পড়ুন: ক্রিমিনালি আন্ডাররেটেড এক অভিনেতা বিজয় রাজ।

এরপরেই তিনি নির্মান করলেন টেস্ট অব চেরি। অনেকে এই চলচ্চিত্রকে আব্বাস কিয়ারোস্তামির শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বলে থাকেন। ১৯৯৭ সালে কানে এটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র তথা পাম দোর পুরস্কার পায়।

এই চলচ্চিত্রের কাহিনী খুব সাধারণ কিন্তু এই চলচ্চিত্র মনোজগতকে নাড়া দিবে প্রচন্ড ভাবে। চলচ্চিত্রটির কাহিনী বাদি নামক এক ব্যক্তিকে ঘিরে যিনি আত্মহত্যা করতে বদ্ধ পরিকর, তার পরিকল্পনা হচ্ছে অনেক ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিজের খোঁড়া কবরে শুয়ে থাকবেন। কিন্তু সকালে এসে কাউকে তার দেহের উপর মাটি দিয়ে যেতে হবে। মানে মৃত্যুর পর কেমন অনুভূতি হয় তা দেখতে চাওয়া। এমন একজনকেই তিনি প্রায় পুরো চলচ্চিত্র জুড়ে খুঁজে বেড়ান। কিন্তু কেউই রাজি হয়না।


এই চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র ছিলো সম্পূর্ণ অপেশাদার একজন শিল্পী। তেমন আব্বাস কিয়রোস্তামি কাজ করেছিলেন শিশু শিল্পীদের নিয়ে ঠিক তেমনই।

২০০৮ সালে নির্মান করলেন তিনি শিরিন চলচ্চিত্র। ইরান তথা সারা বিশ্বে বিখ্যাত খসরু ও শিরিনের প্রেম কাহিনী নিয়ে। অনেকে এই চলচ্চিত্রকে বলে থাকেন চলচ্চিত্রের কবিতা। এতোটাই বিখ্যাত চলচ্চিত্র এটি।

টু ইচ হিচ ওন, সার্টিফাইড কপি, লাইক সামওয়ান ইন লাভ এর মতো চলচ্চিত্র কিংবা এবিসি আফ্রিকার মতো প্রামাণ্য চিত্রের জন্ম ও তাঁর হাতে।

কিয়ারোস্তামি at Like someone in love event
আব্বাস কিয়ারোস্তামি @ Like Someone In Love Event



বিশ্বখ্যাত জাপানী চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়া তাইতো বলেছিলেন ” শব্দ আমার অনুভূতিকে ব্যক্ত করতে পারবে না। আমি বরং আপনাদের তাঁর চলচ্চিত্র দেখার পরামর্শ দেব; তাহলেই বুঝতে পারবেন আমি কী বলতে চাইছি। সত্যজিৎ রায় চলে যাওয়ার পর খুব বিষণ্ন হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আব্বাস কিয়রোস্তামি চলচ্চিত্র দেখার পর ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালাম, কারণ আমরা তাঁর একজন ভালো বিকল্প পেয়েছি। উন্নত বিশ্বের চলচ্চিত্র যখন নিম্নগামী, চলচ্চিত্র নির্মাণে স্বল্প অভিজ্ঞ জাতিসমূহ তখন মূল্যবান সৃষ্টি উপহার দিচ্ছে। কিয়ারোস্তামির চলচ্চিত্র দেখার পর বিষয়টা আমাকে আরো গভীরভাবে ভাবাচ্ছে।

টোকিওতে ‘হোয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম ও ‘লাইফ, অ্যান্ড নাথিং মোর’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীতে বিতরণের জন্য ছাপা লিফলেট থেকে। দীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনে অন্য বিখ্যাত নির্মাতাদের নিয়েও কুরোসাওয়া তেমন একটা কথা বলেননি। আন্দ্রেই তারকোভস্কি, সত্যজিৎ রায় ও জন কাসাভেটসের পর কিয়ারোস্তামি চতুর্থ পরিচালক কুরোসাওয়া যার প্রশংসা করেছিলেন।


আজ কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়ারোস্তামির জন্মদিন। শুভ জন্মদিন চলচ্চিত্রের কবি। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই কিংবদন্তির প্রতি‌।

লেখক: Ahmad Istiak, চলচ্চিত্র সমালোচক