67 / 100

ভারতে আজ পর্যন্ত তৈরী হওয়া অজস্র সব সিনেমার মধ্যে যেগুলোকে সর্বকালের সেরা খেতাব দেওয়া হয়েছে ‘আনান্দ’ তার মধ্যে একটি। এমন ছবি আজকের দিনে বিরল। কি ছিলো না এই সিনেমায়? শৈল্পিক প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ হৃশিকেশ মুখার্জির এই মাইলফলক এর মুক্তির পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হয়েছে গত ১২ মার্চ, ২০২১।

“বাবুমশাই, জিন্দেগী বারি হোনি চাহিয়ে, লাম্বি নেহি।”

এই ছোট্ট একটি বাক্যের মর্ম কতটা গভীর বলতে পারেন? আমরা মানুষ চাই লম্বা সময় বাঁচতে। কতো মানুষ বাঁচেও। কিন্তু জীবনের স্বাদ কে কতটুকু ভোগ করতে পারে? এই জীবনের অর্থ কতটুকু ভেতর থেকে উপলব্ধি করতে পারে? কজন পারে? ভেবেছেন কখনো?

(গল্পের শুরুটা কিভাবে তা নিচের অংশে বলা আছে)

আনান্দ; গল্পের প্রধান চরিত্রের নাম, যাকে কেন্দ্র করেই এই ছবি। বিরল এক কর্কট রোগে আক্রান্ত সে। হাতে খুব বেশি সময় নেই। সব জানা সত্যেও আনান্দ এর চেহারায় একটুও ভয় বা কষ্টের ছাপ নেই। উৎফুল্ল হয়ে ঘুরে বেরায় সে। হাসিখুশি আনান্দ তার আশেপাশের মানুষদের মাতিয়ে রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত। কেউ তাকে দেখে ভাবতেই পারবে না সে এতো বড় দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত এবং নিজে সবকিছুই জানে। সে মানুষকে হাসতে শেখায়। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে শেখায়। জীবন নিয়ে কোন নালিশ নেই তার। নেই কোন আফসোস। কোন এক অপরিচিত মানু্ষের সাথে দুটি কথা বলে, হাসিঠাট্টা করেই সে খুশি৷ কারোর মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই সে সন্তুষ্ট। মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে এভাবেই বেঁচে চলেছে আনান্দ। এমন মানুষকে মৃত্যু কখনো মারতে পারবে?

প্রচন্ড শক্তিশালী এই আনান্দ এর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ভারতীয় সিনেমার ‘প্রথম সুপারস্টার’ রাজেশ খান্না। যদিও এই চরিত্রের জন্য নির্মাতা প্রাথমিক পর্যায়ে রাজেশ খান্নাকে নির্বাচিত করেননি কিন্তু আমার মনে হয় এই চরিত্রে অন্য কেউ তার থেকে অধিক মানানসই হতো না কখনোই। তার অনবদ্য অভিনয় এই সিনেমাকে যে প্রাণ দিয়েছে তা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। তার হাসিমাখা চেহারাটাই আনান্দ চরিত্রটাকে ফুটিয়ে তুলেছিলো অনেক গুণ। এই অভিনয়ের জন্য পরের বছর সেরা অভিনেতার ‘ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড‘ পান রাজেশ খান্না। পার্শ্ববর্তী চরিত্রগুলোতে অমিতাভ বচ্চনসহ আরও যারা ছিলেন তাদের সবাই দারুণ অভিনয় করে দেখিয়েছিলেন। অমিতাভ বচ্চনের দ্বিতীয় সিনেমা ছিলো ‘আনান্দ'(অভিনয়ে)। তার মোট ১৬ টি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড এর প্রথমটি তিনি এই ছবির জন্যই পান (শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা)।

সাধারণের মধ্যে অসাধারণ এই ছবির গল্পের জন্য হৃশিকেশ মুখার্জির প্রশংসা করতেই হয়। সেইসাথে তার দক্ষ পরিচালনা। আর নিখুঁত চিত্রনাট্যের ভেতরে ভেতরে যে কিছু অদ্ভুত সুন্দর ডায়লগ রয়েছে তার জন্য গুলজার সাহেবকে ধন্যবাদ। তার ঐ চমৎকার লাইনগুলো ‘আনান্দ’ এর সফলতার অনেক বড় কারণ সেটা মানতেই হবে, যেগুলো নিপুণভাবে স্ক্রিনে ডেলিভার করে গেছেন রাজেশ খান্না।

সিনেমার গানগুলোর কথা না বললেই নয়। সবগুলো গানই খুব সুন্দর কিন্তু বিশেষভাবে দুটি গানের কথা বলতেই হয়। ‘কাহি দূর যাব দিন ঢ্যাল যায়ে’, মুখেশজির এই গানটির সুর নিয়েই নির্মিত হয়েছিলো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ যা আমাদের সবারই খুব প্রিয়। আরেকটি হচ্ছে মান্না দের কন্ঠে ‘জিন্দেগি কেইসি ইয়ে পাহেলি’। চরম প্রশান্তি জাগানো এক গান। দুটো গানের কথাগুলো খুব বেশি গভীর আর অর্থবহ। চুপচাপ মন দিয়ে শুনলে কেবল শুনতেই ইচ্ছা করে।

‘আনান্দ’ সিনেমা

১৯৭১ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পায় ‘আনান্দ’। সেইসাথে ছয়টি ফিল্মফেয়ার সহ অজস্র পুরষ্কার যা বলে শেষ করা সম্ভব নয়।

আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টি থেকে আনান্দ সেই সিনেমাগুলোর একটি যেগুলো মানুষের জীবনে প্রেরণা জোগায়, দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। মৃত্যুর আগে জীবনে অন্তত একবার দেখা উচিৎ এমনই এক ছবি ‘আনান্দ’। প্রতিষ্ঠিত নয় তবে একটা বিষয় শুধু আমি না অনেক ফিল্ম ক্রিটিকরাই মনে করেন; শারুখ খানের ‘কাল হো না হো’ আনান্দেরই অনুপ্রেরণা থেকে তৈরী।

লেখক: Francis John Rozar