72 / 100

প্রথমেই বলে রাখি, যেহেতু একই পেশায় কাজ করি এবং আগস্ট ১৪ ওয়েব সিরিজের সামনের বা পেছনের সকলকেই ব্যক্তিগত ভাবে চিনি; এজন্য রিভিউ’র স্বার্থে কোনো পারস্পরিক সম্পর্কের সম্বোধনে না গিয়ে সরাসরি ব্যক্তি’র নাম ধরেই উল্লেখ করছি।

১৪ ওয়েব সিরিজে শতাব্দী ওয়াদুদ
আগস্ট ১৪ ওয়েব সিরিজে শতাব্দী ওয়াদুদ

একটু শেষ থেকে শুরু করি। যখন গোয়েন্দা পুলিশ শতাব্দী ওয়াদুদ হাসপাতালে নিজের সুস্থ হয়ে আসা বালিকা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন, দর্শক হিসেবে আমি নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। যতটা না একটি কন্যা সন্তানের বাবা হিসেবে এই অনিশ্চয়তা-দ্বিধা ভেতরে কাজ করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশী কাজ করেছে- অজানা ভয়; সন্তানটি প্রকৃত শিক্ষা পাবে তো? ঠিক ভাবে সু-সঙ্গে বড় হয়ে উঠবে তো? যে ম্যাসেজটি মোটা দাগে গল্পে ফুটে উঠেছে। গল্পটি আমাদের দেশেরই একটি সত্য ঘটনার প্রেক্ষিতে বানানো। পত্র-পত্রিকা, টিভি মিডিয়ার সুবাদে যা জেনেছিলাম, তাতেই গা শিউরে উঠেছিল তখন, আর সেটাই যদি চাক্ষুস দেখা হয়, অন্তরাত্মা সত্যিই কেঁপে ওঠার কথা। তাই হয়েছে অসাধারণ চিত্রনাট্যের গুনে। শুরুর বর্ণনা (যদি ভুল না করে থাকি, নির্মাতা শিহাব শাহিন এর) একদম ম্যাজিক হোল-এর মতো গল্পের ভেতরে সুড়ুত করে টান দিয়ে ঢুকিয়ে ফেলে যেকোনো দর্শককে। কেমন করে নেশা-ড্রাগস-কুসঙ্গ মানুষকে ধ্বংস করে, সেটার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘ঐশী কাণ্ড’। কাছ থেকে ২টি পরিবার দেখেছিলাম, যাদের মাত্র ১ সদস্যের নেশার সংগত এর কারণে পুরো পরিবার তছনছ হয়ে গিয়েছিল; সেখানে এই ওয়েব সিরিজের চরিত্রগুলো খুব চেনা লাগছিলো। যারা ‘ঐশী কাণ্ড’ এর কিছুই জানেন না, তাঁদের একটু সুবিধা করি হাল্কা ‘স্টোরি স্পয়েল’ করে। একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা সস্ত্রীক তাঁদের কৈশোরোত্তীর্ণ মেয়ে দ্বারা নিহত হয়েছিলেন। কেমন করে সত্য উদ্ঘাটন হয়েছিল, কিভাবে মেয়েটি ট্রেস আউট হয়েছিল, কিভাবে মেয়েটির কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছিল, তারই অসাধারণ চিত্রণ দেখি ওয়েব সিরিজটিতে। এখানে চরিত্রদের নাম একটু ভিন্ন ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ‘ঐশী’ হয়ে যায় ‘টুসি’… এভাবে সব চরিত্রই হয়তো।

তিশার অনবদ্য অভিনয়
তাসনুভা তিশার অনবদ্য অভিনয়

নেপথ্যের মানুষদের সম্পর্কে আগে বলি। চিত্র যেমন আঁকা হয় তুলিতে, তেমনি চলচ্চিত্রের তুলি মানে- ক্যামেরা চালিয়েছেন তরুণ নাজমুল হাসান। সৃজনশীলতায় ভরপুর ছিল তাঁর প্রতিটি ফ্রেম। এতটুকু কার্পণ্য করেননি কোনো ফ্রেম ধারণে। কোথাও এতটুকু অবহেলাও চোখে পড়েনি। তাঁর নান্দনিক ক্যামেরা এঙ্গেল দারুণ বিমোহিত করে প্রত্যেক মুহূর্তে। স্বাভাবিক মেকাপের জন্য ধন্যবাদ পেতেই পারেন মহসিন (নাম এটাই জানতে পেরেছি)। একটু একটু করে দর্শক গল্পে ঢোকে, একটু একটু করে জার্নি সচল হয়, আর মেকাপে তাসনুভা তিশা’র (টুসি চরিত্র) পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যদিও বিশেষ একটি দৃশ্য, যেখানে হত্যার দুদিন পরে গন্ধ ছড়ানো বিকৃত ২ লাশের মেকআপ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রবাদপ্রতিম মেকআপ আর্টিস্ট ফারুক সাহেবের সুপুত্র মিলন (এই নামটিও অভিনেতার কাছ থেকে জানা)। বিশেষ এই মেকআপটি যে কারো অন্তরাত্মা শুকিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। লাইটে যিনি ছিলেন, তিনি আলো-আধারির মুহূর্তগুলোকে অসাধারণ দ্যোতনা দিয়েছেন। চিরচেনা ‘আপনঘর-১’ হাউজটি সেট ডিজাইনারের যোগ্যতায় বদলেই গিয়েছিল। ধন্যবাদ তাঁরও প্রাপ্য।

১৪ ওয়েব সিরিজে মুনিরা মিঠু
আগস্ট ১৪ ওয়েব সিরিজে মুনিরা মিঠু

এবার আসি অভিনেতাদের কাছে। পুরো গল্পের জার্নি টেনে নিয়ে যান গোয়েন্দা পুলিশ শতাব্দী ওয়াদুদ। কাজের চাপে প্রচন্ড অসুস্থ বাচ্চাকে সময় দিতে না পারা, স্ত্রীর ভর্ত্তসনা সহ্য করা এবং কাজের প্রতি প্রগাঢ় দায়িত্ববোধের অদ্ভুত দোটানা দেখা যায় তাঁর চরিত্রে। সুদক্ষ অভিনেতা শক্ত ভাবেই তাঁর চরিত্রটি আমাদের সামনে তুলে ধরেন। ‘ডেসটিনি’ নিয়ে ব্যস্ত মা ‘মনিরা মিঠু’ বাইরের জগত সামলাতে গিয়ে কোথায় যেন সংসারের রাশ টানতে খেই হারান; এই চরিত্রে গুনী অভিনেত্রী মনিরা মিঠু অসামান্য কাজ দেখিয়েছেন। কাজের চাপে ব্যস্ত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা শহিদুজ্জামান সেলিম তাঁর সর্বোচ্চ দিয়েছেন; যদিও তাঁর চরিত্রে খুব বেশী কিছু করবার ছিল না। মেয়ের নেশাগ্রস্থ সময়কালীন তাঁর অস্থিরতা, মেয়েকে কন্ট্রোলে আনার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে কখনো হাল ছেড়ে দেয়া, কখনও সরল মনে মেয়েকে বিশ্বাস করা… এসব কিছুই সেলিম সহজাত স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই পরিবেশন করেছেন। কিছু না করেও অদ্ভুত ভাবে আমাকে মুগ্ধ করেছে বাড়ির কাজের মেয়ে’র চরিত্রের শিশু অভিনেত্রী। কি অসামান্য তার এক্সপ্রেশন। কিছু জায়গায় আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, সে যে একজন অভিনেত্রী! এবার আসি, নাম ভূমিকায় অভিনয় করা তাসনুভা তিশা প্রসঙ্গে। আমি অন্য কাউকে ছোট করবো না, এই চরিত্রের জন্য আমি আর কোনো অভিনেত্রী অনেকক্ষণ ভেবেও খুঁজে পেলাম না। এতো ডাইমেনশন, এতো চারিত্রিক টানা-পোড়েন, কিশোরীসুলভ ভুলগুলো ঘটিয়ে ফেলার বৈশিষ্ট্য, নিষিদ্ধ কাজের প্রতি আকর্ষিত হওয়ার ছেলেমানুষি আর কোনো অভিনেত্রী এতো নির্দ্বিধায় ফুটিয়ে তুলতে পারতো বলে আমি এই ক্ষণে মনে করি না। হয়তো আমরা ভবিষ্যতে এমন ভালো অভিনেত্রী আরো পাবো; কিন্তু এখন নেই… দুঃখিত। অভিনেতা ইরফান সাজ্জাদ একবার আমাকে বলেছিলেন, এই মেয়ে জাস্ট বারুদ; ও যে কী লেভেলের অভিনেত্রী, এখনো পাব্লিক বুঝতে পারছে না!’ আমি এখন পূর্ণ একমত। আসলে কারো কারো উপরে বাজি না ধরলে বোঝা যায় না। আলোচনায় আসি। খালু চরিত্রে হিন্দোল রায়, ডিবি চরিত্রে উজ্জ্বল মাহমুদ ভালো করেছেন। ডিবি চরিত্রে নুরে আলম নয়ন এর উপস্থিতি বেশ কমিক্যাল রিলিফ দেয় টানা টেনশন থেকে; যদিও কিছু স্থানে তাঁকে কিঞ্চিৎ অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে; কিন্তু পুরো গল্পের বিচারে দারুণ করেছেন তিনি। ডিবি কর্মকর্তা ফখরুল বাশার মাসুম সহজাত অভিনয় গুণে দারুণ ভাবে চরিত্রগুলোকে চালিত করেছেন। বিল্ডিং এর ম্যানেজার চরিত্রে সাজু, মামা চরিত্রে সুজাত শিমুল, তালাচাবি ঠিক করা যুবক’কে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কখনো স্বাভাবিক, কখনো ‘ওভার ডু’ লেগেছে। গুনী অভিনেতা জাহাঙ্গীর কেনো এই সংলাপবিহীন ‘দারোয়ান’ চরিত্র করলেন, বোধগম্য নয়। নেশাগ্রস্থ বন্ধু ও যৌনসঙ্গী জিমি, রুমী চরিত্রের সৈয়দ জামান শাওন, আবু হুরায়রা তানভীর দুর্দান্ত করেছেন। এছাড়াও ছোট ছোট চরিত্রে সিএনজি ওয়ালা, ফরেন্সিক ডাক্তার রাসেল রাজ ভালো করেছেন।

এই ওয়েব সিরিজে আমরা দীর্ঘদিন দেখে আসা পিকচারাইজেশনের কিছু আগল ভাঙ্গা দেখলাম। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য গালি-গালাজ দেয়া, ড্রাগস নেয়া দেখানো, সেক্স… এমনি আরও বেশ কিছু। এমন নয় যে, এগুলো আর কেউ দেখাচ্ছেন না বা দেখানো হচ্ছে না। ওয়ার্ল্ড ক্লাস যে কোনো ওয়েবেই এখন এগুলোর জয়জয়কার; তবে এখানে প্রকৃত অর্থেই গল্পের খাতিরে এমন ভঙ্গীতে সেসব উপস্থাপিত হয়, আলাদা করে চোখে বাজে না। তবে, অবশ্যই সাবধানতার খাতিরে বাবা-মায়ের সাথে না দেখতে বসাই ভালো। এই ওয়েব সিরিজটি প্রত্যেক কিশোর কিশোরীর দেখা এজন্য উচিৎ, যেন তারা নেশার ক্ষতিকর দিকগুলো বুঝতে পারে। একদম পরিশেষে নির্মাতা শিহাব শাহিন সম্পর্কে কাজী নজরুলের সুরে সুর মিলিয়ে একটা কথাই বলবো- কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই…

~ ফরহাদ লিমন চৌধুরী। লেখক, অভিনেতা, পরিচালক।