63 / 100

সেনগুপ্তঃ “থামুন মশাই, টোটাল ট্যাবূ, ভ্যূডুইজম, উইচক্র্যাফট , মাম্বো-জাম্বো ।  আপনি , আপনার ব্যারাম হলে কি আপনি, ওঝা কে কল দেন ?”

মনমোহন মিত্রঃ  “তাও দিয়েছি মিস্টার সেনগুপ্ত । অনোন্যপায় হয়ে দিয়েছি , ওই জঙ্গলে আর ডাক্তার কোথায় পাবো বলুন?

আর সে কি রকম ওঝা জানেন ? পাঁচশ মেডিসিনাল প্ল্যান্ট এর গুণাগুণ তার নখদর্পণে । সে আমায় সারিয়ে তুলেছিলো । এমনিতে কল দিইনা বটেই । যেকারণে  এই ঘরে সোফায় বসে আপনাদের সঙ্গে চা-বিস্কুট খাচ্ছি সেকারণেই দিইনা ।

একটা সহজ ব্যাপারকে কেন এতো  জটিল  করে  তুলছেন  বলুন তো ?আপনি কেন  বুঝতে পারছেন না , আমি নিজে জংলী নই এটা আমার পরম আক্ষেপের বিষয় , যে আমি জংলী নই । আমি আলতামিরার গুহাবাসীর মতন বাইসন আঁকতে পারিনা ।

কিন্তু উপায় কি বলুন ? ঘর ছাড়ার অনেক আগেই আমার মজ্জার মধ্যে ঢুকে গেছে  সেক্সপিয়ার, বঙ্কিম, মাইকেল, মার্ক্স , ফ্রয়েড , রবীন্দ্রনাথ ! সেজন্যেই তো আমার ফিল্ডনোটস এর দরকার হয় ।

আমি নিজে জংলী হলে কি দরকার হতো ? হতো না ।  

চলচ্চিত্র
আগন্তুক চলচ্চিত্রের দৃশ্য

বর্ণনাকৃত ৩০ সেকেন্ডের এই সংলাপটি সত্যজিৎ রায়ের সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘আগন্তুক’ থেকে নেয়া । ৩০ সেকেন্ডের এই সংলাপ থেকেই মোটামুটি ধারণা করা যাচ্ছে যে পুরো ছবিটি কেমন হতে পারে । সত্যজিৎ রায়কে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলিচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে । তার চলচ্চিত্রে আমরা তারই জীবন দর্শনের প্রতিফলন দেখি ।

আজকে আগন্তুক ছবিটি নিয়ে ছোট একটি বিশ্লেষণ লিখবো । ১৯৯১ সালের শেষের দিকে ছবিটি মুক্তি পায় ভারতীয় এবং ফ্রেঞ্চ যৌথ প্রযোজনায় । এ ছবিটির গল্প টি যেন শুধু গল্পই নয়, এ যেন এক জীবন দর্শন । সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্প ‘অতিথি’ অবলম্বনে এ ছবিটি নির্মিত হয়েছে ।  গল্পে চলে যাই, কলকাতায় বসবাসরত একটি উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার, বাবা সুধীন্দ্র বোস, মা অনীলা এবং একটি ছোট ছেলে। হঠাৎ একদিন অনীলার কাছে একটি চিঠি এলো ৩৫ বছর আগে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া তার ছোট মামার কাছ থেকে। ৩৫ বছর পর তিনি ফিরে আসছেন, কিছুদিন কলকাতায় তাদের বাড়িতে থাকতে চান।  ১৯৫৫  সালে  মামা  যখন  দেশ  ছাড়েন  তখন  অনীলার বয়স মাত্র ২ বছর, তাই মামাকে নিয়ে তার কোন স্মৃতিই নেই। তাছাড়া বর্তমানে এই ছোট মামার রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় বলতে একমাত্র সেই। সুতরাং তার পরিচয় নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার কোনই উপায় নেই। এমনওতো হতে পারে ইনি মামা নন কিন্তু কোন একটা মতলবে এখানে এসে জুড়ে বসতে চান, স্বামী প্রচণ্ড সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে যার কিছুটা প্রভাব পরে স্ত্রীর উপরও। আর ছোট ছেলেটি শুরু থেকে সম্ভাব্য জাল দাদুর আগমনে রোমাঞ্চ অনুভব করতে থাকে। আগন্তুক মামা মনোমোহন মিত্র কলকাতায় পৌছানোর পরই কাহিনী কাহিনী সামনের দিকে এগুতে থাকে।  চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বটি সেই কথিত মামার পরিচয় এবং তাকে মামা হিসেবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে । দ্বন্দ্বটির নিষ্পত্তির জন্য বাড়ির কর্তা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন, যার সর্বশেষ কৌশলটি ছিলো তার আইনজীবী বন্ধু সেনগুপ্ত বাবুকে বাসায় নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা । যাইহোক , ছবিটিতে আর কি কি হলো তা বলছিনা কিন্তু বলছি আমার পর্যবেক্ষণকৃত কিছু বিষয় ।

চলচ্চিত্রের পোস্টার
আগন্তুক চলচ্চিত্রের দৃশ্য

প্রথমেই বলি যে জীবনদর্শন সত্যজিৎ রায় এছবিতে দেখিয়েছেন তা অনন্য । রায়ের অন্যান্য চলচ্চিত্র গুলোও দার্শনিক চিন্তা চেতনা বহন করে, কিন্তু আগন্তুক যেন একদম কেতাবি দর্শন । সম্পূর্ণ ছবিটা জুড়ে যে জীবন দর্শন , বিজ্ঞান দর্শন ছড়িয়ে রয়েছে তা আমাদের মনের খোরাকের পাশাপাশি মাথার খোরাকও যোগাবে । সাইন্সের যেসব ছোট ছোট বিষয় ক্লাসের গদবাঁধা ভাষার ব্যাবহারের কারণে কঠিন মনে হতো, এ ছবিতে মামা মোহনমিত্র তা কত সহজ এবং আনন্দময় ভাবে শিখিয়ে দিলেন । কিভাবে এস্কিমোরা ইগলু হাউজ বানায় তাও বলে দিলেন কত সরল ভাষায় ।

মামা খ্যাত মোহন মিত্র এই ছবিতে আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ৭ টি ভাষা ব্যবহার করেছেন; বাংলা, ইংরেজি, ইতালিয়ান, জার্মান, সংস্কৃত, স্প্যানিশ এবং সাঁওতালী । এছাড়া অষ্টম আরেকটি ভাষায় যে তিনি কথা বলতে পারতেন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা তা হচ্ছে হিন্দি । ছবিতে একবারের জন্য হিন্দি ব্যবহার না করলেও আমরা বলতেই পারি তিনি হিন্দি ভাষায়ও দক্ষ ছিলেন । তার চরিত্র টি আমায় ইতালিয় দার্শনিক, শিক্ষাবিদ গ্রামসির কথা মনে করিয়ে দেয় । গ্রামসিও তার জীবন দর্শনে এমন বিপ্লবী ভাবনার ভাবুক ছিলেন যেমনটা আমাদের মনমোহন মিত্রবাবু । কিভাবে জীবন কে ব্যয় করলে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যায় তা মিত্র মামা আমাদের কে খুব সহজভাবে শিখিয়ে দিলেন । স্পেইনের আলতামিরার গুহাবাসীর মতন বাইসন আঁকতে পারবেন না বলে যিনি আঁকাই বন্ধ করে দিয়েছেন, যিনি মাত্র wanderlust ( ভ্রমণের আকাংখা ) এর কারণে পরিবার পরিজন ছেড়ে সেই আদিবাসীদের সাথে থেকেছেন বছরের পর বছর , কি জীবন !

রায়
সত্যজিৎ রায়

প্রত্যেকটি চরিত্র ই এছবিতে অনন্য অভিনয় শৈলী প্রদর্শন করেছেন , কিন্তু আমি বলবো রায়বাবু জানতেন কোন চরিত্রটি কোথায় বসলে, ক্যামেরাটা কোথায় ধরলে, ব্যাকগ্রাউন্ড টা কি রাখলে এই গল্পের থেকে জীবন দর্শন টাকে সবটুকু বের করে আনা যায় , এবং সেটাই তিনি এই চলচ্চিত্রে করে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন ।

শেষ করছি আরেকটি ছোট সংলাপ দিয়ে,

মনমোহন মিত্রঃ ” আর কোন জিনিসটা কখনো হবেনা কথা দিয়েছ ?”

নাতীঃ “কূপমণ্ডূক।”

IMDB – 8.1

Personal- 9.1

লেখক: মোতাসিম হিমু, চলচ্চিত্র সমালোচক